মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
জমে উঠেছে হাজীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচন-২০২০। প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভায় মেয়র পদে এবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুইজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বর্তমান মেয়র আ.স.ম মাহবুব-উল আলম লিপন ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সাবেক মেয়র আলহাজ আব্দুল মান্নান খান বাচ্চু।
বর্তমান মেয়র আ.স.ম মাহবুব-উল আলম লিপন গত ৫ বছরের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য নৌকা প্রতীকে আবারো ভোট কামনা করেন। অপরদিকে বিএনপির প্রার্থী গত ১২ বছরের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের তার সততা, নিষ্ঠা ও উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চান। তারা দুইজনেই পৌরসভার উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত এবং পৌরবাসীর দুঃখ-দুর্দশায় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন।
আগামি ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে হাজীগঞ্জ পৌরসভার ভোটগ্রহণ। এখানকার ভোটাররা আগের মতোই ব্যালেট পেপারের ভোট দিবেন। ইতোমধ্যে ভোট নিয়ে সব বয়সের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ দেখা গেছে। তবে, গত ১২ জানুয়ারি উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের একাংশের মিছিল থেকে পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় পুলিশের দায়েরকৃত মামলা নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে শংকা সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু ২০ জানুয়ারি হাইকোর্টে জামিনের মাধ্যমে সেই শংকা কেটে গেছে বলে প্রার্থী নিজেই মনে করছেন।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা জমে উঠলেও মেয়র প্রার্থীদের মূলত প্রচারণা শুরু হয়েছে ২০ জানুয়ারি থেকে। নৌকার প্রার্থীর বিজয়ের লক্ষ্যে ১৯ জানুয়ারি পৌরসভার সব ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কর্মীসভা শেষে করেছে। এরপর ২০ জানুয়ারি পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডে গণসংযোগের মধ্য দিয়ে প্রচারণা শুরু করেন আ.স.ম মাহবুব-উল আলম লিপন।
২০ জানুয়ারি বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ১০৯ জন নামীয় আসামির (নেতাকর্মী) জামিনের পর বিএনপির প্রার্থী আলহাজ আব্দুল মান্নান খান জোরেশোরে শুরু করেছেন প্রচার-প্রচারণা। এতে করে ব্যস্ত সময় পার করছেন মেয়র, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা। দুপুর দুইটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মাইকের শব্দে সরগরম থাকে পুরো পৌর এলাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে তৃণমূলের রাজনীতি।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ওবায়েদুর রহমান জানান, পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে ২ জন, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে সংরক্ষিত চারটি ওয়ার্ডে ১৫ জন ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১২টি ওয়ার্ডে ৫২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মোট ভোটার সংখ্যা ৪৫ হাজার ৩৪৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২২ হাজার ৯৫৫ জন এবং নারী ভোটার ২২ হাজার ৩৯৩ জন।
এই ৪৫ হাজার ৩৪৮ জন ভোটার পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডের ২০টি কেন্দ্রে ভোট দিবেন। আবার ২০টি কেন্দ্রে মোট ভোট কক্ষের সংখ্যা ১২৮টি এবং অস্থায়ী ভোট কক্ষ রয়েছে ১৯টি।
সরেজমিনে পৌর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পৌর এলাকায় এখন নির্বাচনী হওয়া বাইছে। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রার্থীরা লিফলেট বিতরণ, পোস্টার সাঁটিয়ে, ব্যানার টানিয়ে, মিছিল ও মাইকিং এবং প্রার্থীরা তাদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ভোটারদের ঘরে ঘরে যাওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনি মাঠে নিজেদের প্রার্থী হওয়ার খবর জানাচ্ছেন। এমনকি অনেক প্রার্থীর স্ত্রীদেরও ভোটারদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে দেখা গেছে।
অপরদিকে বাদ যায়নি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকও। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ফেসবুকে চলাচ্ছেন জোর প্রচার-প্রচারণা। কোন ওয়ার্ডে কোন প্রার্থী বিজয়ী হবেন তাও আবার অনেকে আগাম ধারণা করে ফেসবুকে জানান দিচ্ছেন। রয়েছে পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানও নির্বাচনী আলোচনায়। আশার বাণী হচ্ছে এ পর্যন্ত প্রার্থীদের মাঝে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার খবর পাওয়া যায়নি। এককথায় সরগরম নির্বাচনী মাঠ।
এদিকে হাজীগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকলেও পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সেই মতবিরোধ এখন আর চোখে পড়ছে না। দলের হাই কমান্ড এবং কেন্দ্র ও স্থানীয় সাংসদ মেজর অব. রফিকুল ইসলাম বীরউত্তমের নির্দেশনায় দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন। ফলে অনেকটাই ফুরফুরে মেজাজে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নৌকা মার্কার প্রার্থী বর্তমান মেয়র আ.স.ম মাহবুব-উল আলম লিপন।
প্রার্থী আ.স.ম মাহবুব-উল আলম লিপন তার কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে ব্যাপক গণসংযোগ করছেন। এছাড়া নৌকা প্রতীকের সমর্থনে উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও নিয়মিত গণসংযোগ করতে দেখা গেছে। সাথে যোগ দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আ.স.ম মাহবুব-উল আলম লিপন বলেন, পৌরবাসীর সার্বিক সহযোগিতা ও ভালোবাসা নিয়ে আমি দায়িত্বে থাকাকালে সাধারণ মানুষের আশার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছি। সেই সাথে গত পাঁচ বছর পৌরসভার সব ওয়ার্ডে সমবন্টনের ভিত্তিতে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছি। গরিব ও মেহনতি মানুষের পাশে সবসময় থাকার চেষ্টা করেছি। তাই এখানকার ভোটাররা নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।
অপরদিকে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকলেও গত ১২ জানুয়ারি উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের একাংশের মিছিল থেকে পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় তা আবারো প্রকাশ্যে আসে। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বর্তমানে সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা বিএনপির নেতৃবৃন্দ। পুলিশের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে উপজেলা ও পৌর বিএনপি বা অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কোন নেতাকর্মী জড়িত নয় বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
লিখিত সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এমএ রহিম পাটওয়ারী বলেন, সরকারি দলের মদদে ওইদিন বিকালে হাজীগঞ্জ উপজেলা ও পৌর ছাত্রদলের নামে ড. মো. আলমগীর কবির পাটোয়ারীর ব্যানারে একদল উশৃঙ্খল লোক মিছিলের নামে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অবশ্য ২০ জানুয়ারি হাইকোর্টে জামিনের মাধ্যমে সেই শংকা কেটে গেছে বলে বিএনপির প্রার্থী আলহাজ আব্দুল মান্নান খান বাচ্চু নিজেই মনে করেন।
যার প্রমাণও পাওয়া গেছে, ইতোমধ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আলহাজ আব্দুল মান্নান খাঁন বাচ্চুর পক্ষে গণ-সংযোগ করেছেন বিএনপির কেন্দ্রিয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইঞ্জি. মমিনুল হকসহ উপজেলা ও পৌর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এছাড়া সাবেক সাংসদ মরহুম এমএ মতিনের সমর্থিত হিসেবে পরিচিত উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ড. মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারীর নেতৃত্বে বিএনপির অপর একটি অংশও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী আলহাজ আব্দুল মান্নান খান বাচ্চু বলেন, পৌর নির্বাচনে সবাই মতবিরোধ ভুলে দলের প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেমেছেন। তারা তাদের প্রার্থীকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে পৌরসভার প্রতিটি ঘরে ঘরে দলীয় প্রতীক ধানের শীষের সালাম পৌঁছে দিচ্ছেন। তিনি ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে তিনি প্রশাসন, পুলিশ ও রিটার্নিং অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট কামনা করেন।
পৌরসভা নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকতা মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন জানান, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বদ্ধপরিকর প্রশাসন বলে জানিয়েছেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক বেগম অঞ্জনা খান মজলিশ। তিনি গত ১৫ জানুয়ারি প্রার্থীদের সাথে এক মতবিনিময় এ কথা বলেন।
২০টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। তাই পরিবেশ ও পরিস্থিত স্বাভাবিক এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন গ্রহণে পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ভোটকেন্দ্রে থাকবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, প্রতি কেন্দ্রে ১২ জন পুলিশ সদস্যের সাথে আনসারের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে পুলিশ ও র্যাব দায়িত্ব পালন করবে।
২৫ জানুয়ারি, ২০২১।
