হাজীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬ বছর পর ফের চালু অপারেশন থিয়েটার

এনসিডি কর্নারে ৩ হাজার রোগী বিনামূল্যে এক মাসের ঔষধ ও সেবা পাবে

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
স্বাস্থ্য কর্মকর্তার একান্ত প্রচেষ্টা ও তাঁর আর্থিক সহযোগিতায় অবশেষে ৬ বছর পর তালা খুলেছে হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটার কক্ষের (ওটি)। ২০১৫ সালের পর বৃহস্পতিবার সেখানে রাখি সাহা নামের এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর সিজারের মাধ্যমে অপারেশন থিয়েটার কক্ষটি দীর্ঘদিন পর ফের চালু করা হয়। এছাড়া অপর একজন মায়ের সিজার ও একজন অসহায় রোগীর হার্নিয়ার অপারেশন করা হয়।
সরকারি হাসপাতালের এই অপারেশন থিয়েটারটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হওয়ায় এই উপজেলার ৪ লক্ষাধিক মানুষের ভোগান্তি অনেকটা লাঘব, বিশেষ করে গরিব ও অসহায় মানুষ উপকৃত হবে বলে মনে করেন সাধারণ জনগণ। একইসঙ্গে বিনামূল্যে সিজারিয়ান, হার্নিয়া, টিউমার, ফোঁড়া, অর্থোপেডিকসসহ বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি অপারেশনসহ যাবতীয় সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন রোগীরা।
জানা গেছে, দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার অভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটারটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়। এতে করে অ্যানেসথেসিয়া যন্ত্র, ডায়াথার্মি মেশিন, সাকার মেশিন, হাইড্রোলিক ওটি টেবিল, অটোক্লেভ যন্ত্র, শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি), স্ট্যান্ডবাই ওটি ও সিলিং লাইট, স্টাবিলাইজারসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক লাইন অকেজো ও অপরাশেনের বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়।
এর ফলে উপজেলার বৃহৎ জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকে। চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় গরিব ও অসহায় মানুষকে। এই সুযোগে উপজেলা সদরে গড়ে উঠে বেশ কয়েকটি ক্লিনিক। আশংকাজনক হারে বাড়তে থাকে গর্ভবতী মাদের সিজার। যেখানে অতিরিক্ত ফি দিয়ে অপারেশন করতে হচ্ছে অনেক রোগীর। এছাড়া ভুল অপারেশনে রোগী মৃত্যুর মতো ঘটনার অভিযোগ রয়েছে এসব বেসরকারি ক্লিনিকের বিরুদ্ধে।
এর মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসাবে ডা. মো. গোলাম মাওলা যোগদানের পরেই নজর দেন অপারেশন থিয়েটার কক্ষের দিকে। কিন্তু কোথা থেকে কি শুরু করবেন- তা বুঝে উঠতে একটু সময় লেগে গেল। কারণ, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় যন্ত্রাংশসহ অপারেশন থিয়াটারের সবকিছুই অকেজো হয়ে পড়ে। কিন্তু না, তিনি পিছপা হননি। যেই কথা, সেই কাজ।
ডা. মো. গোলাম মাওলা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে শুরু করলেন অপারেশন থিয়েটার কক্ষের সংস্কার কাজ। শুরুতেই হাত দিলেন, স্যানেটারি ও বিদ্যুৎ লাইনের সংস্কার। তারপর ওটির যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, ডায়াথার্মি মেশিন, সাকার মেশিন, হাইড্রোলিক ওটি টেবিল, অটোক্লেভ যন্ত্র, স্ট্যান্ডবাই ওটি ও সিলিং লাইট, স্টাবিলাইজারসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশের কিছু মেরামত ও কিছু নতুন। তবে বেশিরভাগ নতুন করে ক্রয় করলেন।
মোটামুটি যখন সবকিছুই প্রস্তুত। তখন টাকার অভাবে অ্যানেসথেসিয়া মেশিন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের (এসি) অভাবে চালু করা যাচ্ছিলো না অপারেশন থিয়েটারটি। অবশেষে নিজস্ব অর্থায়নে এসব যন্ত্রাংশ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন ডা. মো. গোলাম মাওলা। তিনি প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে অ্যানেসথেসিয়া মেশিন ও শীতাতাপ যন্ত্র (এসি) সহ আনুসাঙ্গিক প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় করে তা অপারেশন থিয়েটার কক্ষে স্থাপন করলেন।
শুরু হয়ে গেল অপারেশন। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে দুইটি সিজারিয়ান ও একটি হার্নিয়া অপারেশনের করা হয়েছে। যা সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে অপারেশন থিয়েটার ছাড়াও হাসপাতালের সৌন্দয্যবর্ধন, প্রশাসনিক ও সেবার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রমকে ঢেলে সাজাচ্ছেন ডা. মো. গোলাম মাওলা। যা আগামি একমাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে করে সেবার মান আরো বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে প্রথম সিজারিয়ান মা রাখি সাহা ও তার স্বামী সুজন সাহা জানান, বেসরকারি হাসপাতালে যেখানে সিজার করতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে হাসপাতালে (উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) বিনামূল্যে সিজার হয়েছে, তা ভাবতেই অবাক লাগে। এসময় রাখি সাহা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা চিকিৎসক ও নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান।
কথা হয়, ঠান্ডাজনিত রোগের চিকিৎসা নিতে আসা আনোয়ার হোসেন আনুর সাথে। তিনি বলেন, শুনেছি হাসপাতালে অপারেশন করা হচ্ছে। শুনে খুবই ভালো লাগছে। কারণ, আমরা যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসি, তারা অধিকাংশই গরিব মানুষ। বিনামূল্যে অথবা স্বল্পখরচে অপারেশন হলে আমরা উপকৃত হবো এবং আমাদের আর বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হবে না।
এ বিষয়ে আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, স্যারের (উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা) এই মহতি উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। আশা করছি, স্যারের নেতৃত্বে সহকর্মী ও উপজেলাবাসীর আন্তরিক সহযোগিতায় আমরা সেবাগ্রহিতাদের আরো ভালোভাবে সেবা দিতে পারবো।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. গোলাম মাওলা বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাস্থ্যখাতে সরকার নানামুখী কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সরকারের এসব কর্মসূচী বাস্তবায়নে আমরা তৃণমূল পর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি।
এসময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বিষয়ে তিনি বলেন, সহকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অপারেশন থিয়েটারটি চালু করে ইতোমধ্যে তিনটি অপারেশন করা হয়েছে। আরো দুইটি অপেক্ষমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি হার্নিয়া ও অপরটি গলব্লাডারের অপারেশন। তবে আমরা তাড়াহুড়ি করছি না। কারণ, হাসপাতালের নিয়মিত সংস্কারসহ আরো কিছু কাজ বাকি আছে। এগুলো সম্পন্ন হলে অপারেশনসহ অন্যান্য সেবার মান বৃদ্ধি পাবে।
ডা. মো. গোলাম মাওলা আরো বলেন, উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগীদের জন্য নন কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এটি চালু হলে, রোগীরা নিয়মিত ফলোআপসহ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা আর এক মাসের ওষুধ পাবেন (বরাদ্দসাপেক্ষে)। যদিও এখনো আমরা এসব সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে এনসিডি কর্নার চালু হলে আলাদাভাবে মাসে ৩ হাজার রোগীকে সেবা দেওয়া যাবে।

১৫ আগস্ট, ২০২২।