স্টাফ রিপোর্টার
ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা স্বপন বেপারী। ছোটকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার বুকে কর্মসংস্থানের পিছনে ছুটে বেড়িয়েছেন। পুরান ঢাকার অলি-গলিতে রাবারের জুট কেনা-বেচা করেই অতিবাহীত করছেন জীবনের অর্ধেক সময়কাল। খাদ্যের পিছনে ছুটতে গিয়ে একটা সময় ভুলেই গিয়েছেন তার জীবন যৌবনের কথা। অবশেষে মধ্য বয়সে এসে গড়েছেন সংসার জীবন। স্বপন বেপারী দু’ছেলে এবং একটি মেয়ের জনক। বড় ছেলে নাদিম (নবম) শ্রেণির ছাত্র, ছোট ছেলে স্থানীয় একটা মাদ্রাসায় (হাফিজি) বিভাগে অধ্যয়নরত এবং ছোট মেয়েটি (চতুর্থ) শ্রেণিতে পড়ছে।
শারীরিকভাবে জটিল অসুস্থতায় পড়ে যাওয়ায় ঢাকা থেকে চলে আসতে হয় তাকে গ্রামের বাড়িতে। ৬ সদস্যবিশিষ্ট সংসারের ভরণ-পোষণ এবং তার চিকিৎসার টাকা যোগান দিতে একান্ত বাধ্য হয়ে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে একাধিকবার ঋণ উত্তোলন করেছেন। ঋণের কিছু অর্থ স্থানীয় ভাটিয়ালপুর চৌরাস্তায় চায়ের টং দোকানে ব্যয় করেন। আর বাকি টাকা দিয়ে তার চিকিৎসার কাজে খরচ করে মোটামুটি সুস্থ হন। এতো কিছুর পরও অসহায় শিপন বেপারী সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন।
প্রতিবেশী মোহাম্মদ রসু মিয়া জানান, স্বপন বেপারী সেই ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। পারিবারিক অভাব অনটনের সংসারে তাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। মাঝখানে শারীরিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় কয়েকমাস হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকতে হয়েছে। চিকিৎসা খরচ এবং সংসারের ভরণ-পোষণের জন্য এলাকাবাসী ও নানাজনের কাছে হাত পেতে কিছু অর্থ সংগ্রহ করেন। আর বাকি অর্থ যোগান দিতে বাবার দেয়া সম্পত্তির অংশটুকু বিক্রি করে দেন। এখন তিনি অসহায় মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। যে কোন সময় তাকে পৈত্রিক ভিটে থেকে উচ্ছেদ হয়ে যেতে হবে।
স্বপন বেপারীর অস্থায়ী বসতভিটায় গিয়ে দেখা যায়, বড় ছেলে অভিযোগ করছে- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার সাথে থাকা সহপাঠীদের রঙ-বেরঙের জামা পড়া থাকে। তার পড়নে পুরোনা জামা কাপড় থাকায় সহপাঠীরা তার থেকে দূরে থাকে। তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে নাদিম বলেন, অনেক সখ একটা স্কুল ব্যাগ নেওয়ার, দামের কথা মনে পড়লে সখের কথা ভুলে যাই। পিতার অর্থনৈতিক অবস্থা দেখলে মনে চায় পড়ালেখা বাদ দিয়ে কোন কর্মে জড়ায়ে যাই। অভাবের সংসারে বেড়ে উঠায় শরীরের গঠনও পরিপাটি নেই। অনেক জায়গায় কাজের সন্ধান করেছি, সাইজে ছোট বলে নিতে চায় না।
স্বপন বেপারীর ভাতিজা কামাল হোসেন শেখ জানান, আমার চাচার বৃদ্ধা মাসহ ৬ সদস্য বিশিষ্ট সংসার। উত্তরাধিকার সূত্রে সে বাবার তেমন কোন সম্পত্তি পায়নি। ভাটিয়ালপুর চৌরাস্তার ছোট একটি চায়ের দোকান রয়েছে। সেটি আজ কয়েকমাস যাবত বন্ধ রয়েছে। তিনি সেই কিশোর বয়স থেকেই পায়ের ব্যথায় ভুগছিলেন। তাই বেশি হাটা ও চলাফেরা করতে পারেন না। মাঝখানে জটিল রোগের অপারেশন করতে গিয়ে প্রায় ৩ লাখ টাকা ঋণ করে আজ অসহায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অবশেষে তার একমাত্র সম্বল বসতভিটেটুকু বিক্রি করে দিয়ে এ ঘাট ও ঘাট ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যে কোন মুহূর্তে তাকে উচ্ছেদ হয়ে যেতে হবে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্বপন বেপারী জানান, দীর্ঘদিন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ঋণের বোঝায় চাপা পড়ে গেছি। সেই কিশোর বয়স থেকেই বাত ব্যাথা নিয়ে ভালোই ছিলাম, হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতায় অর্থনৈতিক অবস্থাকে দমিয়ে দিয়ে উল্টো ঋণের মধ্যে ফেলে দিলো। পারিবারিক চাহিদা বলতে এখন দু’মুঠো ভাত হলেই যেনো পূর্ণিমার চাঁদের মত লাগে। ধারাবাহিকভাবে বিগত প্রায় ৭টি ঈদ যাচ্ছে, স্ত্রী সন্তানদের জন্য নতুন কোন কাপড় কিনতে পারিনি। নিজের জন্য তো নাই। কর্মসংস্থান বলতে ছোট একটা টং দোকান আছে, সেখানে গড়ে হাজারখানেক টাকার মত বিক্রি করি। যা বিক্রি করি তা চা-পাতি চিনি কিনেই শেষ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে পালিয়ে বেড়াতে না পেরে নিজের পৈত্রিক সম্পত্তির পাওয়া অংশটুকু বিক্রি করে দেই। যারা কাছে বিক্রি করেছি, তিনি এখনো গ্রামে আসেনি। যখন আসবে আমাকে এই চিরচেনা বাবার দেয়া ভিটে মাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশ পাড়ি জমাতে হবে।
সেই কোরবানী ঈদের সময় অন্যের দয়ায় গরুর মাংস খেতে পেরেছি। ছেলে-মেয়েরা কত অভিসাপ দিচ্ছে। ছোট মেয়েটা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতেছে, গরুর মাংস দিয়ে ভাত খাবে। আমি আশ্বস্ত করেছি, কিন্তু কিভাবে সম্ভব। আমার মাথার উপর ঋণের বোঝা। আজ প্রায় ৩ দিন পালিয়ে বেড়াচ্ছি। জানি না এভাবে চলবে কত কাল। আমিও তো এ দেশের নাগরিক। যদি কারো দয়া হয়- তাহলে আমার সন্তানদের কথা চিন্তা করে মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। আমার বিকাশ একাউন্ট নম্বর ০১৮৩৮০৯৭১৭২ (পার্সোনাল), এনসিসি ব্যাংক একাউন্ট (বিউটি বেগম-স্ত্রী) নম্বর ০০৭৯০৩১০০৫৬২৬৪, ফরিদগঞ্জ শাখা।
২৫ নভেম্বর, ২০২০।
