সাড়ে ৩শ’ মাদক কারবারীর বিরুদ্ধে সোয়া ৩ শতাধিক মামলা

চাঁদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেড় বছরে ১৬ শতাধিক অভিযান

মাদক বিরোধী উদ্ধার অভিযানে ব্যাপক সাফল্য——-

এস এম সোহেল
সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে চাঁদপুর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বেশ তৎপর রয়েছে। বেশ কয়েকটি অভিযান সাড়া জাগানো অভিযান করেছে চাঁদপুর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। চাঁদপুর দেশের ট্রানজিট জেলা হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌ, রেল ও সড়ক পথে নিয়মিত মাদক আনা-নেওয়া হয়ে থাকে। আর এ মাদক কারবারি ও বহনকারীদের উপর কঠোর নজরদারি করে আসছে চাঁদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অধিদপ্তরটি স্বল্প জনবল থাকা সত্ত্বেও দিনরাত জেলার ৮টি উপজেলায় মাদবিরোধী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
চাঁদপুর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এ কে এম দিদারুল আলম যোগদানের পর থেকে বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনি যোগদানের পর গত দেড় বছরে চাঁদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ১৫শ’ ৯৮টি অভিযানে মামলা রুজু করা হয়েছে ৩শ’ ২২টি, আসামি গ্রেফতার করেছে ৩শ’ ৪৯জন। এসব অভিযানে ইয়াবা উদ্ধার করেছে ৩৬ হাজার ৬শ’ ৩৭ পিস, গাঁজা সাড়ে ৪৩ কেজি, ফেনসিডিল ১শ’ ৭১ বোতল, চোলাই মদ ৪০ লিটার, বিয়ার ৫ ক্যান, বিদেশী মদ ৮ বোতল, সিএনজি ২টা, মোটরসাইকেল ৩টা, মোবাইল সেট ২টি, বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন ৪ এ্যাম্পুল এবং নগদ ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭শ’ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০১৯ সালে মোট ৬০৮টি মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানে নিয়মিত মামলা হয়েছে ৫০টি। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে মামলা হয়েছে ৭৯টি। সাধারণ ডায়রি ৬টি। মোট ১৩৫টি মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৩৫ জনকে। এছাড়া ইয়াবা ট্যাবলেট ২ হাজার ৯৫০পিস, গাঁজা প্রায় ২ কেজি ৫০ গ্রাম, ফেন্সিডিল ১০ বোতল ও চোলাই মদ ২৩.৪০০ লিটার জব্দ করা হয়।
২০১৮ সালে মোট ৬২৯টি মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অভিযানে নিয়মিত মামলা হয়েছে ৫০টি। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে মামলা হয়েছে ৭৪টি। সাধারণ ডায়রি একটি। মোট ১২৫টি মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৩০ জনকে। এছাড়া ইয়াবা ট্যাবলেট ২ হাজার ৪৪৬ পিস, গাঁজা প্রায় ৬ কেজি ৪০০ গ্রাম, ফেন্সিডিল ২২ বোতল ও বিয়ার ১৪৪ ক্যান জব্দ করা হয়।
২০২০ সালের ৬ এপ্রিল চাঁদপুর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সহকারী পরিচালক এ কে এম দিদারুল আলম যোগদানের পরপরই চাঁদপুরে মাদকের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সাড়া জাগানো অভিযান পরিচালনা করেন। মাদকের গডফাদারদের গ্রেফতার করে আলোচনায় আসেন তিনি।
চাঁদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালনক এ কে এম দিদারুল আলম বলেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো ট্রলারেন্স নীতিতে চলছে। এই ব্যাপারে চাঁদপুর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কঠোর অবস্থান রয়েছে। আমাদের অভিযান সবসময়ই চলবে। মাদকমুক্ত চাঁদপুর করার জন্য নিরলসভাবে করে যাচ্ছি। এই ব্যাপারে জনসাধারণের সচেতনতা মুখ্য ভূমিকা রাখছেন। এখানে সবাইর সহযোগিতা পেয়েছি এবং চাঁদপুরের জনগণ এই ব্যাপারে খুবই সচেতন তারা সবসময় সহযোগিতা করে আসছে।
তিনি আরো বলেন, চাঁদপুর জেলায় বিগত বছরের এপ্রিল মাসে যোগদানের পর থেকে বর্তমান বছরের মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ দেড় বছরের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে দেড় হাজারেরও বেশী মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছি। স্বল্প জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট থাকা সত্ত্বেও আমরা মাদক বিরোধী অভিযানে কোন প্রকার শিথীলতা দেখাইনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়তে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ করতে আমি বিন্দুমাত্র পিছপা হবো না। তবে মাদকের সাথে সম্পৃক্তরা আমার এ কাজ ভাল চোখে দেখছে না। তাই একটি মহল আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রভাকান্ডা প্রচার করছে, যাতে করে আমি মাদক বিরোধী অভিযান বন্ধ করে দেই। যত বিরোধীতাই করা হোন না কেন আমি যতদিন চাঁদপুর জেলায় আছি ততদিন মাদক নিয়ন্ত্রণে মাদক উদ্ধার অভিযান নিয়মিত চালিয়ে যাবো।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭৬ সনে এক্সাইজ এন্ড ট্যাক্সেশন ডিপার্টমেন্টকে পুনরায় পুনর্বিন্যাসকরণের মাধ্যমে নারকটিকস এন্ড লিকার পরিদপ্তর নামে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন ন্যস্ত করা হয়। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত নারকটিকস এন্ড লিকার পরিদপ্তরের মূল লক্ষ্য ছিল দেশে উৎপাদিত মাদকদ্রব্য থেকে রাজস্ব আদায় করা। আশির দশকে সারা বিশ্বে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে এ সমস্যার মােকাবেলায় মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধ, মাদকের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে গণসচেতনতার বিকাশ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে ১৯৮৯ সনের শেষের দিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮৯ জারি করা হয়। অতঃপর ২ জানুয়ারি ১৯৯০ তারিখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ প্রণয়ন করা হয় এবং নারকটিকস এন্ড লিকারের স্থলে একই বছর তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ তারিখ এ অধিদপ্তরকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাস্ত করা হয় ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালেয়র অধীন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। দেশে অবৈধ মাদকের প্রবাহ রোধ, ঔষধ ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহার্য বৈধ মাদকের শুল্ক আদায় সাপেক্ষে আমদানি, পরিবহন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মাদকদ্রব্যের সঠিক পরীক্ষণ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ, মাদকদ্রব্যের কুফল সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরোধ কার্যক্রমের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে নিবিড় কর্ম-সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অধিদপ্তরের প্রধান দায়িত্ব।
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১।