মাছের দাম দরিদ্র ও অসহায় ক্রেতাদের নাগালের বাইরে
মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষ যখন বিপাকে তখন সবকিছুর পাশপাশি হাজীগঞ্জে মাছের সংকটও চলছে চরমে। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে যে পরিমাণে মাছ বাজারজাত হয়, তা সাধারণ ক্রেতাদের প্রায় নাগালের বাইরে। যোগান কমে যাওয়ায় অস্বাভাবিক ও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের মাছ। এজন্য দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের মধ্যে অনেকেই এখন মাছের দামের সাথে স্বর্ণের দামের সঙ্গে তুলনা করছেন।
মাছের এই বাড়তি দামের কারণ হিসাবে মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর ভরা বর্ষায় প্রয়োজনীয় ও পরিমাণমতো বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মাঠে পানি থাকা তো দূরের কথা পুকুর, খাল ও বিলেও পরিমাণমতো পানি নেই। ফলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন নেই এবং বর্ষায় বিলের মধ্যে যে মৌসুমি মাছ চাষ হওয়ার কথা, তা তিল পরিমাণও হয়নি। এছাড়া পানির অভাবে পুকুর, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ব্যাপকহারে কমে গেছে।
দেখা গেছে, প্রাকৃতিগতভাবে প্রতি বছর বর্ষায় ভেসাল, চাই ও জালসহ অন্যান্য ফাঁদে পাতা ছোট মাছ নিয়মিত পাওয়া যেতো এবং বর্ষা শেষে ভাদ্র মাসের শুরু থেকে আশি^ন মাস পর্যন্ত বাজারে ভরপুর থাকতো দেশীয় ছোট প্রজাতির মাছসহ ধরনের ছোট-বড় মাছ। এতে বাজারের চাষ বা উৎপাদনকৃত মাছের চাহিদা অনেকটা কমে যেতে এবং দাম থাকতো হাতের নাগালে। কিন্তু এ বছর প্রাকৃতিকগতভাবে উৎপাদনকৃত মাছ নেই বললেই চলে।
যার ফলে বাজারে সব ধরনের মাছের দাম চড়া। হাজীগঞ্জ বাজারসহ অন্যান্য বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব ধরনের মাছে কেজিপ্রতি ৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। তিন বা চারটা কেজির রুই মাছ কেজি প্রতি ২২০-২৫০ টাকা, আধা কেজি উপরে ২৫০-৩২০ টাকা এবং এক কেজি বা তার বেশি ওজনের রুই মাছ সাড়ে ৩৫০-৪২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই দাম কার্প ও কাতলা মাছের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
অথচ দুই মাস আগেও তিন/চারটা কেজি ওজনের রুই মাছ কেজি প্রতি ১২০-১৫০ টাকা, আধা কেজি বা তার উপরে ওজনের কেজি প্রতি ১৫০-২০০ টাকা এবং এক কেজি ওজনের রুই মাছ ২২০-২৭০ টাকা বিক্রি হয়েছে। এছাড়া দেশী কই, শিং ও পাবদা মাছ প্রকারভেদে ৫০০-১২০০ টাকা, নদীর ছোট চিংড়ি ও বাইলা মাছ কেজি প্রতি ৭০০-১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় সাইজের দাম আরেকটু বেশি।
অপরদিকে নিম্নবিত্ত ও গরিব মানুষের পছন্দের তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, ব্রিগেড ও সিলভার কার্প, মাছের দাম অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেখা গেছে, ৫/৬টা কেজি ওজনের তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৮০ টাকা, যা আগে বিক্রি হতো ৭০-১০০ টাকায়। ৩/৪টা কেজি ওজনের ১৫০-২০০ টাকা। আগে বিক্রি হতো ১০০-১২০ টাকা। আধা কেজি বা তার বেশি ওজনের কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ২০০-২৫০ টাকা। আগে বিক্রি হতো ১৩০-১৬০ টাকা।
পাঙ্গাস, ব্রিগেড ও সিলভার কার্প আধা কেজি থেকে এক কেজি ওজনের প্রতি কেজি মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৭০ টাকায়। যা আগে বিক্রি হতো ৭০-১৩০ টাকা। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৫০-২৩০ টাকা। আগে বিক্রি হতো ১২০-১৬০ টাকা। দেড় বা দুই কেজি ওজনের মাছ বিক্রি হচ্ছে ২২০-৩০০ টাকা। একই মাছ আগে বিক্রি হতো ১৫০-২০০ টাকায়। যা দরিদ্র ও অসহায় ক্রেতাদের অনেকটা নাগালেই বাইরে।
কথা হয়, জাকির হোসেন নামের একজন ক্রেতার সাথে। তিনি জানান, রুই-কাতলা কেনার সামর্থ আগেও ছিল না, এখনো নেই। তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, ব্রিগেড ও হাইব্রিড কই মাছ কিনে খেতাম। কিন্তু এ বছর তাও কিনতে কষ্ট হচ্ছে। কারণ, সব কিছুর দাম বাড়ার সাথে মাছের দামও বেড়েছে। তাই আগে যদি দুই কেজি মাছ কিনতাম, এখন এক কেজি করে কিনি।
রোকেয়া বেগম নামের একজন গৃহীনি জানান, প্রতিদিন সকালে তিন-চারজন হকার বাড়িতে মাছ নিয়ে আসতো। আমরা দুই-তিন কেজি করে মাছ কিনতাম। কিন্তু এখন এক-দেড় কেজি করে কিনি। আবার দাম বাড়ার কারণে বাড়িতে হকারও কম গেছে, দু’একজন আসে।
ইমান হোসেন নামের একজন আড়ৎদার জানান, মাছের বাজার ভালো। অর্থাৎ মাছ চাষিদের জন্য মাছের বাজার ভালো (দাম বেশি), কিন্তু ক্রেতাদের অনেকটা নাগালের বাইরে। তিনি বলেন, এ বছর খাল-বিল ও জলাশয়ে পানি সংকটের কারণে মা মাছ ডিম ছাড়তে পারেনি, তাই প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন নেই। যার ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় মাছের যোগান অনেক কম। তাই দামও বেশি।
পৌর হকার্স মার্কেটের রুহুল আমিন (মাইজ্জা মিয়া) নামক ফিস মার্চেন্ট এন্ড কমিশন এজেন্টের স্বত্বাধিকারী আকতার হোসেন দুলাল জানান, প্রতি বছর বর্ষার শুরুতেই যখন পানি আসে, তখন মাছের প্রজনন ঘটে এবং মা মাছ ডিম দেয়। এরপর বর্ষার পানিতে মাছের ডিম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। কিন্তু এ বছর পানি না থাকায় মাছের প্রজনন ঘটেনি।
এসময় তিনি বলেন, বর্ষায় কাক্সিক্ষত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানির অভাবে মাছের উৎপাদন কমে গেছে এবং অনেক পুকুর, খাল ও বিভিন্ন জলাশয়ের পানি দূষিত হয়ে মাছ মরে ও পঁচে গেছে। যার ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় মাছের যোগান কম। এই কারণে ভোক্তাদের বেশি দামে মাছ কিনতে হচ্ছে।
০৬ অক্টোবর, ২০২২।
