চাঁদপুরে বিভিন্ন সড়কের পাশে চলছে রমরমা বালু ব্যবসা

পথচারী ও যানবাহন যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে

এসএম চিশতী
চাঁদপুরের সব কয়টি উপজেলায় বিভিন্ন সড়কের পাশে চলছে রমরমা বালু ব্যবসা! যার ফলে নষ্ট হচ্ছে সড়ক এবং সাধারণ মানুষের চলাচল ও যানবাহনের যাত্রীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
সরেজমিনে চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, সড়কের কোথায়ও দু’পাশ, কোথায়ও একপাশ যেনো বালুমহলে পরিণত হয়েছে। চাঁদপুর-রায়পুর সড়কের পাশে বিগত কয়েক বছর যাবত স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন সড়ক জনপদের জায়গা দখল করে বালু ব্যবসা পরিচালনা করছে। এ বিষয়ে স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় বেশ কয়েকবার প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও এখনো কোন ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পথচারী বলেন, এখানকার বালু আশপাশের এলাকা ও রায়পুর এবং লক্ষ্মীপুরে সরবরাহ করা হচ্ছে। অবশ্য এ পথে চলাচলকারী যানবাহন ও পথচারীদের চোখে মুখে বালু প্রবেশ বন্ধ করতে ব্যবসায়ীরা সকাল-বিকাল বালুর মধ্যে পানি দিচ্ছে। কিন্তু এসব পানিতে কোনো কাজ হয় না বরং পানি দেয়ার কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক ও জনপদের সড়কের অনেকাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সড়কে পানি থাকার কারণে কোন গাড়ি আসলে ঐসব পানি ছিটকে যাচ্ছে আরেকটি যানবাহন কিংবা পথচারীর গায়ে। যা মুখ বুজে পথচারীরা মেনে নিতে হচ্ছে। কারণ এখানকার বালু ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এখনে রামরাজত্ব কায়েম করেছেন।
এছাড়া লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক ঘুরে দেখা যায়, সদর উপজেলার বালিয়া এলাকায় এ মহাসড়কের দু’পাশ জুড়ে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেক অবৈধ বালুর ব্যবসা। আবার সড়কের পাশে ব্যক্তিগত জমির ওপর এ ব্যবসা গড়ে তোলা হলেও প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ধরনের অনুমতি নেয়া হয়নি। দেখা যায় সড়কের উপরে বা পাশে সাপদী, বাগাদী, গাছতলা ও ঢালীরঘাট এলাকায়ও গড়ে উঠেছে এ রমরমা বালু ব্যবসা। সড়কের পাশে বালু রাখায় সারাক্ষণই বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে এ বালু যা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীসহ এ খানকার পথচারীদের। শুধু তাই নয় সড়ক দিয়ে যখন যানবাহন চলে সে সময় হঠাৎ চালকদের চোখে-মুখে বালু ঢুকে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বিশেষ করে বাগড়া বাজার এলাকায় বালুর পাহাড় গড়ে তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। সেখানে বালুবাহী গাড়িগুলোও বেপরোয়া চলাফেরা করে।
শুধু চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কই নয়, চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহসড়কসহ জেলার আট উপজেলার প্রায় ১শ’ টি স্থানে সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে এ রমরমা বালুর ব্যবসা!
হাজীগঞ্জ উপজেলায়ও সেই একই চিত্র। প্রশাসনের নাকের ডগায় চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কের পাশে চলছে রমরমা এ বালু ব্যবসা। এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটার পরেও অদৃশ্য শক্তির দাপটে একেবারে মহাসড়কের সাথেই দীর্ঘদিন ধরে এ বালু ব্যবসা চলছে। এছাড়া বলাখাল একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে সড়ক দখল করে বালু ব্যবসা পরিচালনা করায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চলাচলে যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনই পথচারীদের ভোগান্তি হচ্ছে।
হাজীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাথে নবাগত ইউএনও’র মতবিনিময় সভায় সাংবাদিক শাখাওয়াত হোসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তারকে জানালে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বলেন, আমরা তো কারো ক্ষতি করছি না। আমরা সকালেই বালুতে পানি দিচ্ছি এবং সড়কের অনেক দূরে বালু স্তূপ করছি। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
হাজীগঞ্জে বাস্তব চিত্র হচ্ছে বালুর স্তূপ সড়কের খুবই কাছেই। কিছুক্ষণ পর-পর বালু নেওয়ার জন্য ট্রাকগুলো আসছে এবং মূল সড়কে যানজট সৃষ্টি করছে। এই স্থানে কোন ধরনের ট্রাফিক ব্যবস্থা নেই। কিন্তু হরহামেশা বালুর ট্রাকগুলো সড়ক দিয়ে প্রবেশ করছে আর বের হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রসাশনের এক কর্মকর্তা বলেন, হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রসাশন থেকে তাদের বহুবার এ বালু ব্যবসা মহাসড়কের পাশ থেকে আরো দূরে স্থানান্তর করতে বলা হয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। এ বিষয়টি তারাও জানে। কিন্তু বার-বার সময় নিয়েও কথা রাখছে না তারা।
বিষয়টি নিয়ে চাঁদপুর জেলা পরিবেশ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, সড়কের পাশে খোলামেলা পরিবেশে বালু ব্যবসা করা যাবে না, এটাই সত্যি। যে কারণে আমাদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বালু ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়েছে। যে কোনো সময়েই এদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, যে কোনো সড়কের পাশে বালুর ব্যবসা করা এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ একং পরিবেশবান্ধব নয়। তাই আমরা এর আগেও বিভিন্নস্থানে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। আবার যেহেতু জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখন সড়কের পাশে রমরমা বালুর ব্যবসা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তাই দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হবে।
অবশ্য এ বিষয়টি বহুবার সংবাদপত্রের মাধ্যমে চাঁদপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের দৃষ্টিতে আনা হলে তারাও কোন ধরনের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি তারা। যার ফলে বহাল তবিয়তে সড়ক ও জনপদের স্থান দখল করে ব্যবসায়ীরা বালু ব্যবসা করে চলছেন। বালুর অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয় এলাকার মানুষজন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজনের দাবি, পরিবেশের ক্ষতিকর এ ধরনের ব্যবসা মহাসড়ক থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পরিচালনা করতে প্রশাসন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এছাড়া অতি দ্রুত বালু ব্যবসা স্থানান্তর করতে জেলা প্রশাসনের মাসিক আইন-শৃংখলা বৈঠকে এ বিষয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য সড়ক ও জনপদ বিভাগকে নির্দেশ প্রদানে জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি কামনা করেছেন সচেতন মহল।

২৭ এপ্রিল, ২০২১।