চাঁদপুরে স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে আবারো কলেজ অধ্যক্ষকে অপসারণ

হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

বিশেষ প্রতিনিধি
চাঁদপুর সদর উপজেলার ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজের ‘প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিয়ে বিতর্ক’, বিএনপি আমলে এক অধ্যক্ষকে স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে অপসারণ, বর্তমান অধ্যক্ষকে আরেক জাল-জালিয়াতি ও নিয়মনীতির কোন তোয়াক্কা না করে অব্যাহতি পত্র প্রেরণ ইত্যাদির ঘটনা চলছে বর্তমানে কলেজটির অভ্যন্তরে কলেজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। কোনভাবেই এই কলেজটির জালিয়াতি কমছেই না।
কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের কোন ধরনের তোয়াক্কা না করা, সভাপতি নিজেই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে চলছে টানাপোড়ন। কলেজ বন্ধ অবস্থায় সভাপতির সাংঘর্ষিক নিয়মে ক্ষুব্ধ পরিচালনা পর্ষদের অনেক সদস্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় থেকে কলেজটির সার্বিক বিষয়ে লাগাম টেনে না ধরলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। যাদের শ্রম ও ঘামে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ, তাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী উচ্চ শিক্ষার একটি ধাপ বন্ধ হয়ে যাবে। যার ফলে এ এলাকার শিক্ষার্থীরা তাদের প্রকৃত শিক্ষা অর্জন থেকে বঞ্চিত হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি অনুসন্ধান, কলেজ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সম্প্রতি কলেজের ৩ শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষামন্ত্রীসহ আরো বিশিষ্টজনদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখির বিষয় অভিযোগ আনা হয়। এতে গ্রেফতার হন ৩ শিক্ষক। মামলাটি চলমান রয়েছে। ওই মামলার বাদী হয়েছেন একই কমপ্লেক্সের মধ্যে থাকা ফরক্কাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত হান্নান মিজি। তদন্ত করলে দেখা যাবে হান্নান মিজির এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার কোন যোগ্যতাই রাখেন না। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দীর্ঘদিন শর্ষের মধ্যে ভূত থাকার কারণে অপরাধীদের চেহারা ফুটে উঠেনি। তবে কোন ভাল লোক পরিচালনায় আসলেও তাদের থাকতে দেয়া হয় না, এসব প্রতিষ্ঠানে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র আছে, যারা কখনো এই প্রতিষ্ঠানের ভাল চায়নি। তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য সব ধরনের কাজ ও পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির সাথে তাল মিলিয়ে চলছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দন্ত চিকিৎসক ডা. সেলিম তালুকদার বলেন, আমাদের দেখামতেই ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এলাকার বহু মানুষের শ্রম ঘামে এই অবস্থায় এসেছে। কমিটির বর্তমান লোকজন অনেক সত্য লুকিয়ে রেখেছে। যারা এই কলেজ উদ্বোধন করেছেন অর্থাৎ মেজর অব. রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম তাদের উন্মোচনের ফলকটিও সরিয়ে ফেলেছে তারা। এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থা যাতে কোনভাবে ধ্বংস না হয়, সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সচেতন এলাকাবাসী।
ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, কলেজে চলমান যে সব প্রসঙ্গ নিয়ে অনিয়ম হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে আমি সর্বশেষ ৮ অক্টোবর মিটিংয়ে জোর প্রতিবাদ করেছি। সভাপতি সুজিত রায় নন্দী নিজেই সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একজন অধ্যক্ষকে ছুটিতে রেখে কিভাবে আবার অব্যাহতি দেয়া হয়। অব্যাহতি পত্রের ফটোকপি তিনি আমাদের দেখাতে পারেননি।
প্রায় একই ধরনের কথা বলেছেন আরেক সদস্য জহিরুল ইসলাম তালুকদার। তিনি বলেন, সভাপতি সাংঘর্ষিক নিয়মে বর্তমান অধ্যক্ষকে অব্যহতি দেখিয়েছেন। তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমরা রেজুলেশনে স্বাক্ষর দিয়েছি। কিন্তু অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান যদি কোন অপরাধ করে থাকে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ দেয়ার প্রয়োজন ছিলো। তার ছুটি শেষে যোগদান করতেন, তারপর তাকে অব্যাহতি দিতেন এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দেয়া যেত।
কলেজ কমিটির আরেক সদস্য আমিনুল হক বিএসসি বলেন, বর্তমান অধ্যক্ষ ছুটিতে ছিলেন। অব্যাহতি পত্রও দিয়েছেন। যদিও আমরা অব্যাহতি পত্র দেখিনি। তবে সবার সিদ্ধান্তই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ হয়েছে।
এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে কলেজের নতুন পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন হয়। এই কমিটির অভিভাবক সদস্য আ. রাজ্জাক মিজি বলেন, কমিটি গঠন হওয়ার পর কোন দাওয়াত পাইনি। অক্টোবর মাসের ৬ তারিখে কলেজের চলতি দায়িত্বে থাকা ম্যাডাম আমাকে ফোন দিয়ে বললেন মিটিং হবে, আপনাকে জানাব। এরপর ৮ তারিখ সকালে আবার ফোন দিলে আমি মিটিং যাই। কিন্তু মিটিং যেসব আলোচনা হয়েছে, সেগুলো তারা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন।
কলেজ পরিচালনায় দীর্ঘদিন থাকা নির্বাচিত ও অনুমোদিত কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন (সাবেক ইউপি সদস্য) বলেন, এই কলেজের অনেক কাজের আমি প্রত্যক্ষদর্শী। তবে এমন সিদ্ধান্ত কোনদিন দেখিনি। একজন অধ্যক্ষকে দুই মাসের ছুটিতে রেখে অব্যাহতি দেয়া, কোন নিয়মের মধ্যে পড়ে না। সভাপতি সুজিত রায় নন্দী নিজেই সব সিদ্ধান্ত একা নিয়েছেন। আমি প্রতিবাদ করে বলেছি আমরা যেন আপনার এ ধরণের সিদ্ধান্ত কোন বিপদে না পড়ি। তিনি বলেছেন, কিছুই হবে না আমি মন্ত্রী ও এমপিদের সাথে কথা বলেছি। উনার কথায় রাজ্জাক মিজি ছাড়া বাকি সব সদস্য স্বাক্ষর দিয়েছে। যদি কোন অনিয়ম হয়, তাহলেই সবাই আইনের আওতায় আসবে।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ হাসান খান বলেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার কারণে আমি ২৩ আগস্ট থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটিতে ছিলাম। আমি কোন অব্যাহতি পত্র দেইনি। যদি দিয়ে থাকি তাহলে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমার অব্যাহতি পত্র সাংবাদিকদের দেখাতে পারেন।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফরক্কাবাদ ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি সুজিত রায় নন্দীর মুঠোফোনে অনেকবার ফোন করে কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি মোবাইল ফোন না ধরায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
২৭ অক্টোবর, ২০২০।