জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন পদ্মা-মেঘনা পাড়ি

চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ বয়া ও লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই

ইলশেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুর ও শরীয়তপুর জেলার চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন পদ্মা-মেঘনা নদী পাড়ি দিচ্ছে। এমন জীবন ঝুঁকিতে প্রতিদিনই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে স্বজনরা অপেক্ষা করে তাদের প্রিয় মানুষটি এই বুঝি ফিরলো তাদের মাঝে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যখন সতর্ক সংকেত কিংবা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন স্বজনরা খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার করুণার অপেক্ষায় বসে থাকে। যেন তাদের মাঝে স্বজন হারানোর কোন দুঃসংবাদ না আসে।
জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে এমন যখন দৈনন্দিন চিত্র, তখন তাদের বিকল্পই বা কি করার থাকে। ভাগ্যকে মেনে নিয়েই জীবন বাজী রেখেই ছুটতে হয় নদীর এপার থেকে ওপারে। এমন চিরাচায়িত দৃশ্য পরখ করতে হয় চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নসহ পাশের জেলা শরীয়তপুরের চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের।
নদীপথেই তাদের স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজগামী শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ শ্রমজীবী এসব এলাকার হাজার-হাজার মানুষ প্রতিদিন তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্টিলের ট্রলারেই উত্তাল পদ্মা-মেঘনা পাড়ি দিয়ে থাকে। আর এসব ট্রলারে নেই জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট বা বয়া।
অতিসম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রলারডুবির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে এই অঞ্চলের মানুষদের মাঝে। এজন্য তারা সরকারে কাছে দাবি জানিয়েছে, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যেন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তাহলেই হয়তো বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যেতে পারো অনেক প্রাণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদপুর শহর থেকে প্রতিদিন মেঘনা নদীর ৩০টি চরের মানুষ জীবনের ঝুঁকিই নদী পাড়ি দিচ্ছে। এসব এলাকার ট্রলার চালকরা নিজেরাই তেমন সচেতন নয়। যার কারণে যাত্রীদের মাঝে সর্বদা আতংক বিরাজ করতে থাকে। পাশাপাশি ট্রলারগুলোতে নেই জীবন রক্ষাকারী কোন লাইফ জ্যাকেট ও বয়া।
রাজেরাজেশ্বর ইউনিয়নের যাত্রী শরীফ মিয়া ও শরীয়তপুরের তারাবুনিয়ার যাত্রী হজরত আলী ঢালী জানান, ব্যবসায়িক কাজে প্রতিদিন আমাদের ট্রলারে করেই আসতে ও যেতে হয়। বর্ষা মৌসুম ছাড়াও আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসগুলোতে নদী ব্যাপক উত্তাল থাকে। তীব্র স্রোত থাকায় ট্রলারগুলো ঝুঁকিতে থাকে। এজন্য আমরা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের কাছে দাবি জানাই ট্রলারগুলোতে বয়া ও লাইফ জ্যাকেট সরবরাহসহ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
তবে এসব চরাঞ্চল এলাকার বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, তাদের সুন্দর জীবন-যাপন ও শহর-বন্দরের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পড়া-লেখা ও জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে যেন নদীপথে সরকারিভাবে লঞ্চ, স্টিমার কিংবা ফেরির ব্যবস্থা যেন করা হয়। পাশাপাশি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাঝি পর্যায়ের লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।
নদীপথের মাঝি সমবায় সমিতির সভাপতি সেলিম মোল্লা জানান, চলাঞ্চলের মানুষ ছাড়াও অন্যান্য জেলার মানুষ পদ্মা-মেঘনা দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। যার কারণে ট্রলারগুলোতে থাকা সামান্য কিছু বয়া ও লাইফ জ্যাকেট দিয়ে যাত্রীদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।
চাঁদপুর সদরের রাজরাজেশ্বর ইউপির চেয়ারম্যান হাজি হযরত আলী বেপারী বলেন, ব্যবসায়িক, চিকিৎসা, লেখাপড়াসহ বিভিন্ন কাজে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে করে নদী পাড়ি দিচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদী বেশি উত্তাল থাকে। এতে করে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায়। আমি নিজেও অনেকবার পদ্মা-মেঘনার উত্তাল টেউয়ে পড়েছি। এমন পরিস্থিতি রোধে প্রশাসনিকভাবে বিশেষ পদক্ষেপ প্রয়োজন।
চাঁদপুর নৌ-থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, পদ্মা-মেঘনায় আমাদের সার্বক্ষণিক টহল থাকে। আমাদের পক্ষ থেকে ট্রলারের মাঝিদের সতর্ক করা হয়। যাতে তারা পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও বয়া রেখে চলাচল করে। এতে করে ভাটার সময় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভবনা বেশি থাকে। আমরা সেই সময়ে ট্রলারের মাঝিদের ঝুঁকি এড়িয়ে চলাচল করতে নির্দেশনা প্রদান করি।
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১।