ফরিদগঞ্জে জেলে অনাথ চন্দ্র দাস হত্যা রহস্য উন্মোচন

নারায়ন রবিদাস
ফরিদগঞ্জে জেলে অনাথ চন্দ্র দাসের লাশ উদ্ধার হওয়ার ৫ দিনের মাথায় হত্যা রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগিশন (পিবিআই)। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সোহাগ নামে একজনকে আটক করেছে পিবিআই। সোহাগকে আটকের পর সে হত্যার কথা স্বীকার করে। এছাড়া তার কাছ থেকে অনাথ চন্দ্র দাসের মুঠোফোনটিও উদ্ধার করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জমি সংক্রান্ত বিরোধের মূল হোতা সুবল দাসসহ ৪ জন জড়িত বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, নিহত অনাথ চন্দ্র দাস ১৮ বছর আগে নিজের চাচাতো ভাই সুবল দাসের কাছ থেকে ৩ শতক জমি কিনেন। সেই ক্রয়কৃত জমি তিনি শেষ পর্যন্ত বুঝে পাননি। কিন্তু জমি দখল-স্বত্ব বুঝে পেতে বছরের পর পর সালিস বৈঠকসহ সব কিছুই করেছেন। ত্রিশ হাজার টাকা জমির জন্য খরচ করেছেন প্রায় লাখ টাকা। শিকার হয়েছের মারধরের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জমির জন্যই তাকে নৃংশসভাবে খুন হতে হলো। নিখোঁজের ৭ দিন পর তার অর্ধগলিত দেহ উদ্ধারের পর ছায়া তদন্তে নেমে ৫ দিনের মাথায় পিবিআই হত্যাকণ্ডের রহস্যজাল ভেদ করে।
পিবিআই সূত্র মতে, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ভাড়াটে খুনির হাতেই খুন হতে হয় অনাথ চন্দ্র দাসকে। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত কড়ৈতলী বাবুর বাড়ির পাশে থাকা সেকান্দর গাইন ওরফে শেখার ছোট ছেলে সোহাগকে পিবিআই আটকের পর সে হত্যার কথা স্বীকার করে। সোহাগের কাছ থেকে অনাথ চন্দ্র দাসের মুঠোফোনটি উদ্ধার করে। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জমি সংক্রান্ত বিরোধের মূল হোতা সুবল দাসসহ ৪ জন জড়িত বলে জানা গেছে।
কে এই সোহাগ: নানার বাড়ির প্রাপ্ত সম্পত্তির উপর থাকে সেকান্তর গাইনের দুই সন্তান। দক্ষিণ কড়ৈতলী গ্রামের লদ বাড়ির পাশেই তথা বাবুর বাড়ির পাশেই ধোপা বাড়িতে তাদের বাসস্থান। সোহাগ মূলত এলাকায় গাছী হিসেবে পরিচিত। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে সে গাছ কাটার সাথে সাথে দিনমজুরের কাজও করতো। সম্প্রতি সে ও টিটু লদ বাড়ির একটি পুকুর ইজারা নিয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী হিসেবে নাম লেখায়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন গেলে সোহাগের সন্তানসম্ভবা স্ত্রী আমেনা বেগম জানান, তিনি ৬ বছরের ছেলে আরাফাতকে নিয়ে কোথায় যাবেন! কি করবেন! কিছুই বুঝতে পারছেন না! দুইদিন আগে সমিতির লোক পরিচয় দিয়ে কিস্তির বিষয়ে কথা বলতে এসেছে বলে তাদের ঘরের সামনে কয়েকজন লোক আসে। পরে তারা সোহাগকে খোঁজ করে। এসময় আমেনা বেগম তার স্বামী সোহাগকে ফোন দেয়। যদিও তারা কোন সমিতি থেকে ঋণ নেয়নি বলে জানায়। কিন্তু আমেনা বেগমকে দিয়ে সোহাগকে ফোন করিয়ে অবস্থান নিশ্চিত হয়ে সোহাগকে আটক করে পিবিআই। আমনো বেগম জানায়, তার নিজের মোবাইল ফোন ছাড়াও সোহাগের কাছে পাওয়া আরো একটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায় তারা।
স্থানীয় বিভিন্ন লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সোহাগ দিনমজুর হিসেবে কাজ করতো। এছাড়া তার বিরুদ্ধে গুরুতর কোন অভিযোগ নেই।
সরেজমিন এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, পিবিআই সোহাগকে আটকের পর বুধবার দুপুরে সোহাগের মামাতো ভাই কামরুল ও টিটু নামে দুইজনকে আটক করে।
স্থানীয় লোকজন জানান, গত ১৯ জুলাই সকালে অনাথ চন্দ্র দাস কড়ৈতলীর পার্শ্ববর্তী শাহী বাজারে মাছ বিক্রি করতে যান। মাছ বিক্রি করে তিনিসহ লোকজন এসে কড়ৈতলী বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে চা খান। পরে সেখানেই তার কাছে একটি ফোন আসে। এরপর তার সঙ্গীদের কাছে তার কাজ আছে বলে চলে যান। এরপর থেকে তার আর খোঁজ মিলেনি।
ঘটনাস্থল: পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিণ কড়ৈতলী গ্রাম ও সাহাপুর গ্রামেকে পৃথক করা ডাকাতিয়া নদীর শাখা খালের মধ্যে অনাথ দাসের লাশ পাওয়া যায়। লাশ প্রাপ্তির স্থান থেকে ঘাতক সোহাগের বাড়ি কয়েকশ’ গজ দূরে। খালের একপাশে সাহাপুর গ্রামের পণ্ডিত বাড়ির ধান ক্ষেত এবং বিভিন্ন আবাদি ফসল, রয়েছে ঝোপ ঝাঁড়। অন্যদিকে বিপরীত দিকে রাস্তার পাশে পুকুর লদ বাড়িসহ আশেপাশে বাড়ি-ঘর রয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানান, নানা সময়ে এই খালে বিভিন্ন প্রাণির মৃতদেহের গন্ধ ছড়াতো। এসময় তারাও মনে করেছিলেন একই ধরনের কিছু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনাথ চন্দ্র দাসের মৃতদেহই উঠে আসলো।
এলাকাবাসীর জানান, অনাথ চন্দ্র দাস দীর্ঘদিন ধরে মাছ ব্যবসার সাথে জড়িত। কিন্তু কখনো তিনি মজুমদার বাড়ির সংলগ্ন ব্রিজের পাশ দিয়ে যাওয়া খাল পাড়ের রাস্তা দিয়ে চলাফোর করতেন না। তিনি শাহী বাজার, কড়ৈতলী বাজারে মাছ বিক্রি করতেন।
নিহত অনাথ দাসের ভাই রঘুনাথ দাসের স্ত্রী স্বপ্না দাস জানান, তার ভাসুর গত কয়েকমাস ধরেই তার স্বামী তথা ভাইয়ের সাথে তাদের ঘরের রাতযাপন করতেন। প্রতিদিন মাছ বিক্রির জন্য বের হতেন এবং রাতে ফিরে আসতেন। ১৮ বছর আগে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা সম্পত্তির জন্য বছরের পর বছর ধরে নানা ঘটনা ঘটেছে। তার ভাসুর অনাথ চন্দ্র দাস নিখোঁজ হওয়ার সপ্তাহ আগে এই সম্পত্তি নিয়ে মারামারি হয় সুবল দাসের পরিবারে সাথে। সেই সময় অনাধ চন্দ্র দাসকে হুমকি দেয়া হয়।
গত ১৯ জুলাই সকালে তিনি কড়ৈতলীর পার্শ্ববর্তী শাহী বাজারে মাছ বিক্রি করতে যান। এর পর থেকে তার হদিস নেই। তার মুঠোফোনটিও বন্ধ ছিল। অনাথের দুই ছেলে বিকাশের স্ত্রী শিপ্রা দাস ও নয়নের স্ত্রী সুমী দাস জানান, নিখোঁজের পর থেকে তার শ্বশুরের খোঁজে তারা এতদিন বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তিনি মাঝে মধ্যে তার বোন শেফালীর বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার পাইকদি গ্রামে না বলেই বেড়াতে যেতেন। পরে দুই/তিন দিন পর ফিরে আসতেন। এবারো হয়তোবা বোনের বাড়িতে বা অন্য কোথায় বেড়াতে গিয়েছেন। প্রথম কয়দিন এই চিন্তা করেছেন। তছাড়া মোবাইল ফোনের চার্জার ঘরে থাকায় হয়ত মোবাইলে চার্জ নেই। কিন্তু গত ২৫ জুলাই দুপুরে লদ বাড়ির পাশের খালে লাশ পাওয়ার খবরে আমাদের লোকজন ছুটে গিয়ে আমাদের শ্বশুরের লাশ চিহ্নিত করে।
লাশ উদ্ধারের পর অনাথের ছেলে সুবাশ চন্দ্র দাস বাদী হয়ে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এরপর পুলিশের পাশাপাশি ছায়া তদন্তে নেমে ৫ দিনের মাথায় পিবিআই হত্যাকণ্ডের রহস্যজাল ভেদ করে।
পিবিআই সূত্র মতে, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ভাড়াটে খুনির হাতেই খুন হতে হয় অনাথ চন্দ্র দাসকে। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত কড়ৈতলী বাবুর বাড়ির পাশে থাকা সেকান্দর গাইন ওরফে শেখার ছোট ছেলে সোহাগকে পিবিআই আটকের পর সে হত্যার কথা স্বীকার করে। সোহাগের কাছ থেকে অনাথ চন্দ্র দাসের মুঠোফোনটি উদ্ধার করে। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জমি সংক্রান্ত বিরোধের মূল হোতা সুবল দাসসহ ৪ জন জড়িত বলে জানা গেছে।

৩০ জুলাই, ২০২১।