রাজরাজেশ্বরে জেলেদের সাথে প্রশাসনের মতবিনিময়

অসাধু জেলেদের কার্ড বাতিল করা হবে
…ইউএনও সানজিদা শাহনাজ স্মৃতি

শাহ্ আলম খান
চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বরে জেলেদের সাথে সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা করেছে উপজেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইউপি চেয়ারম্যান হাজি হযরত আলী বেপারীর সভাপতিত্বে ও সদর উপজেলা সিনিয়র সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রশিদের পরিচালনায় প্রধান অতিথি সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সানজিদা শাহনাজ (স্মৃতি)।
তিনি তাঁর বক্তব্য বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। সারা বিশ্বে চাঁদপুরের রুপালী ইলিশের বেশ সুনাম রয়েছে। এই সুনাম ধরে রাখতে হলে জাটকা ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইলিশ সম্পদ আরো বৃদ্ধি করতে হবে। ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। যারা জেলেদের মাছ ধরতে নৌকা ও জাল দিয়ে সহযোগিতা করবে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। কোন অবস্থাতেই কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
তিনি আরো বলেন, জাটকা রক্ষা করতে পারলে দেশে মাছের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে। চাঁদপুরের ইলিশ দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। এই অভিযান সফল করার জন্য আমি ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের আরো কঠোর হওয়ার জন্য বলবো। সরকারের এই নির্দেশ কেউ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে। আপনারা তাদের আইনের হাতে তুলে দিবেন। এছাড়া সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা থেকে অসাধু জেলেদের নাম বাদ দেয়া হবে।
জেলেদের উদ্দেশে সানজিদা শাহনাজ বলেন, আমার অনুরোধ- এই দুই মাস মাছ ধরবেন না। আপনাদের জন্য চাল বরাদ্দ হয়েছে ৪ মাসের। আপনারা নদীতে মাছ ধরতে গেলে জেল হবে এক বছরের। এতে আপনাদের ছেলে-মেয়েরা লজ্জিত হবে। এই নদী আমাদের সবার। আপনাদের কাছে অনুরোধ, অভয়াশ্রমকালে নদীতে মাছ ধরতে নামবেন না।
তিনি উপস্থিত নারীদের উদ্দেশে বলেন, নারীরাও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। আপনাদের বাবা, ভাই, স্বামী ও ছেলেরা মাছ ধরে নিয়ে আসলে সেই মাছ কাটবেন না। নদীতে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও কোস্টগার্ড সদস্যরা থাকবেন মনিটরিং করার জন্য।

অসাধু জেলেদের ধরলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার
… ইউপি চেয়ারম্যান হযরত আলী বেপারী

সভাপতির বক্তব্যে রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ হযরত আলী ব্যাপারী বলেন, আমি আপনাদের সন্তানভ আমি আপনাদের ভোটে প্রথমে মেম্বার নির্বাচিত হয়েছি, পরে আপনারা ভোট দিয়ে আমাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছেন। আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আজ আমার কোনো বক্তব্য নেই। শুধু এইটুকু বলবো, আপনারা যদি নদীতে নামেন দোষ পরে চেয়ারম্যানের। আমি মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারি না। আইন-শৃঙ্খলা মিটিংয়ে আমাকে মাথা নিচু করে রাখতে হয়।
তিনি তার বক্তব্যে আরো বলেন, রাজরাজেশ্বরে মেম্বারের বাড়িতে মাছ পাওয়া গেছে, মিডিয়াতে ভাইরাল হয়েছে। নৌ-পুলিশের উপর হামলা হয়েছে। সারা বাংলাদেশে টিভি এবং পত্র-পত্রিকায় ভাইরাল হয়েছে। আমার নাম খারাপ হয়েছে। সবার কাছে আমি লজ্জা পেয়েছি। আমি কারো জন্য কখনো সুপারিশ করতে থানায় যাই না। কেউ বলতে পারবে না হযরত আলী কারো জন্য সুপারিশ করেছে। মা ইলিশ রক্ষার জন্য ঢাকা থেকে নৌ-পুলিশের বিশেষ অভিযান এসেছে, তাদের উপর হামলা হয়েছে- সেজন্য আমি লজ্জিত।
চেয়ারম্যান আরো বলেন, দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ। চাল পাবেন ৪ মাস। যে জেলে নদীতে ধরা পড়বে তার নাম জেলে কার্ড থেকে বাদ পড়বে। দূরের জেলেরা মাছ ধরতে এসে ধরা পরে আর আমার স্থানীয় জেলেদের নাম খারাপ করে। দূরের জেলেদের ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দিবো।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ ভট্টাচার্য বলেন, নদীতে কেউ মাছ ধরতে নামবেন না। এই নদীতে আমরা কেউ মাছ চাষ করি না এবং আমরা মাছকে কোন খাবার দিই না। এটা আল্লাহর নেয়ামত। এই নেয়ামত রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা আপনাদের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন প্রকল্প চালু করেছে। আমি চাই না আপনার মামলায় জড়ান।
সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, সরকার ১৮ থেকে ৩৫ বছরের বেকার নারী ও পুরুষের জন্য বিভিন্ন মেয়াদের প্রশিক্ষণ সেন্টার খুলেছে। আপনাদের এখানে অনেক যুবক আছে বেকার। আমি অনুরোধ করবো- আসেন, প্রশিক্ষণ নেন। আমাদের দরজা সব সময় খোলা।
নৌ-থানার ওসি মো. জহিরুল হক বলেন, আমাদের নৌ-থানার কোনো পুলিশ জেলেদের যদি নদীতে নামায়, আপনারা প্রমাণ সহকারে আমাকে বলবেন। আমি আপনার নাম গোপন রাখবো। এক হয় সে থাকবে, নাহয় আমি থাকবো।
শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার কবির হোসেন বাচ্চু, চাঁদপুর কান্ট্রি ফিশিং বোর্ডের সভাপতি শাহ আলম মল্লিক, মৎস্যজীবী প্রতিনিধি তসলিম বেপারী ও আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মালেক দেওয়ান।
অনুষ্ঠান শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ৪নং ওয়ার্ড মেম্বার ইব্রাহিম কামাল সিরাজী।
জেলেদের মতবিনিময় সভায় সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি হযরত আলী বেপারী। সভায় ইউপি সদস্যবৃন্দ, নৌ-পুলিশ, স্থানীয় জেলে ও আড়ৎদারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজন উপস্থিত ছিলেন।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা শাহনাজ স্মৃতি রাজরাজেশ্বর গিয়ে পৌঁছলে ফুল দিয়ে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান ইউপি চেয়ারম্যান হাজি হযরত আলী বেপারীসহ আরো অনেকে।
মতবিনিময় সভার আগে রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের মুগদী মাস্টারের ঘাট যাত্রী ছাউনী পরিদর্শন করেন ইউএনও সানজিদা শাহনাজ স্মৃতি। পরে রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় পরিদর্শন ও খোঁজ-খবর নেন তিনি। এছাড়া রাজরাজেশ্বর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন ও ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং খোঁজ-খবর নেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার।
উল্লেখ্য, ‘মজিব বর্ষে শপথ নেবো, জাটকা নয় ইলিশ খাবো। জাটকা ধরে করবো না শেষ, বাঁচবে জেলে হাসবে দেশ। রক্ষা করলে জাটকা, মাছ-ইলিশ পাবো ১২ মাস’ এসব স্লোগানে চাঁদপুরে জাটকা রক্ষা কার্যক্রম এবং মার্চ-এপ্রিল দু’মাস পদ্মা ও মেঘনা নদীতে অভয়াশ্রম বাস্তবায়ন বিষয়ক জাটকা সংরক্ষণে জেলেদের সাথে সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৩ মার্চ সদর উপজেলার হানারচরেও জেলেদের সাথে প্রশাসনের সচেতনতামূলক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক বেগম অঞ্জনা খান মজলিশ।

০৪ মার্চ, ২০২১।