দেশে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল, বাড়বে লকডাউনের মেয়াদ
ইলশেপাড় রিপোর্ট
চাঁদপুরে কোথাও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শহর কিংবা মফস্বল, সর্বত্রই একই চিত্র। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে সবাই চলছে যার-যার মতো করে। জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের প্রাণান্ত চেষ্টাও সামাজিক দূরত্ব বা লকডাউন বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। শহরের কাচাবাজারগুলো খোলা স্থানে স্থানান্তরসহ নানা পদক্ষেপ নিলেও মানুষজন ও ছোট যানবাহনের চলাচল বেড়েই চলছে। চাঁদপুর জেলা শহরের সবগুলো হাট-বাজারে এখনো পুরনো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। যদিও আন্তঃজেলার সাথে সড়ক কিংবা নৌ যোগাযোগই কেবল বন্ধ রয়েছে। বাকি সবই আগের মতোই চলমান রয়েছে।
বর্তমানে সারা দেশে চলমান লকডাউন কার্যক্রমে যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, তা অনেকটাই অনুমান করা যাচ্ছে প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল বৃদ্ধির কারণে। রোববারের (১৮ এপ্রিল) রিপোর্ট অনুযায়ী সারা দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১শ’ ২ জন। গত শনি ও শুক্রবার করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১শ’ ১ জন করে। এ পর্যন্ত সারা দেশে করোনায় ১০ হাজার ৩শ’ ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ১৮ হাজার ৯শ’ ৫০ জন। তার মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৬ লাখ ১৪ হাজার ৯শ’ ৩৬ জন।
এদিকে চাঁদপুরে গতকাল পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন ১শ’ ৪ জন। চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার সর্বশেষ দিলীপ চন্দ্র সরকার (৬৫) নামের এক ব্যক্তি মারা যান। তার বাড়ি ফরিদগঞ্জের কড়ৈতলী এলাকায়। তিনি গত ১৪ এপ্রিল করোনার উপসর্গ নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন।
এদিকে চাঁদপুরে গত শনিবার ৪৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ জেলায় মোট করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৮শ’ ২৮ জন। মোট মৃতের সংখ্যা ১শ’ ৪ জন। আর এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৭৬ জন বলে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া চাঁদপুরে গতকাল পর্যন্ত করোনার টিকা নেয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন ৭৫ হাজার ৪শ’ ১২ জন। আর ২য় ডোজ গ্রহণ করেছেন ১৭ হাজার ৫শ’ ৬ জন। এ পর্যন্ত প্রথম ডোজ গ্রহণ করেন ৫৯ হাজার ২শ’ ১৩ জন- বলে জানা গেছে সিভিল সার্জন কার্যালয় সুত্রে। যারা রেজিস্ট্রেশন করে এখনও টিকা গ্রহণ করেনি তাদের দ্রুত টিকা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন সিভিল সার্জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র মতে, গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের কথা জানায় সরকার। গেল বছরের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্তের হার ২০ শতাংশের ওপরে ছিল। এরপর থেকে শনাক্তের হার কমতে শুরু করেছিলো।
গত জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস করোনার সংক্রমণ ছিল তীব্র। মাঝে নভেম্বর-ডিসেম্বরে কিছুটা বাড়লেও বাকি সময় সংক্রমণ নিম্নমুখী ছিল। এ বছর মার্চে শুরু থেকেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে এবার সংক্রমণ বেশি তীব্র।
সারাদেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ায় গত ২৯ মার্চ বেশ কিছু বিধিনিষেধসহ ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করে সরকার। এর মধ্যে ঘরের বাইরে গেলে মাস্কের ব্যবহার অন্যতম ছিলো। কিন্তু সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকলেও জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে বরাবরই মতোই উদাসীনতা ছিলো।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধের গতকাল ছিলো পঞ্চম দিন। এরই মধ্যে রাস্তায় বেড়েছে যানবাহন ও মানুষের চাপ। গতকাল সকাল থেকেই চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন সড়কে অন্য দিনের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে। সন্ধ্যার পরে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকে সবচেয়ে বেশি। যদিও অভিভাবকরা বলছে, তাদের সন্তানরা তারাবী নামাজ পড়ার কথা বলেই ঘর থেকেই বের হচ্ছে। যদিও সব মসজিদগুলোতেই ২০ জনের বেশি মুসল্লি একত্রে জামায়াত না করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সেখানেও কেউ এসব নির্দেশনা মানছেন না।
গত ১৪ এপ্রিল থেকে করোনার সংক্রমণ রোধে সরকারের জারি করা বিধিনিষেধের লকডাউন কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে ৫ এপ্রিল থেকে সাতদিনের জন্য গণপরিবহন বন্ধসহ ১১ দফা কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল সরকার। দু’দিন পরে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সকাল-সন্ধ্যা গণপরিবহন চলার অনুমতি দেয় সরকার। এর একদিন পর খুলে দেওয়া হয় শপিংমলও। এরই মধ্যে করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বাড়তে থাকে সারা দেশে।
এরপর গত ৯ এপ্রিল সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ১৪ এপ্রিল থেকে ‘কঠোর ও সর্বাত্মক লকডাউন’ দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। এর পরেই ১২ এপ্রিল ১৩ দফা নির্দেশনা দিয়ে ১৪ এপ্রিল থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। যা বর্তমানে বলবত আছে।
এদিকে গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসির ভবনে নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে ১ হাজার শয্যার করোনা হাসপাতাল। গতকাল দুপুরে হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। আজ সোমবার সকাল থেকেই হাসপাতালটিতে রোগী ভর্তি শুরু হবে বলে জানা গেছে। হাসপাতালটিতে আইসিইউ বেড আছে ১শ’ ১২টি। এইচডিইউ বেড ২শ’ ৫০টি। এছাড়া ১শ’ ৩৮টি আইসিইউ মানের বেড রয়েছে। এই বেডগুলো কেন্দ্রিয় অক্সিজেন সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত।
হাসপাতালটির জরুরি ওয়ার্ডে ৫০টি বেড রাখা হয়েছে। এই ৫শ’ ৫০টি বেডের বাইরে আরও ৪শ’ ৫০টি বেড থাকবে, সেখানে মারাত্মক আক্রান্ত রোগীদের রাখা হবে বলে জানা গেছে।
রেকর্ড পরিমাণ এই মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত থাকলে ফের লকডাউনের মেয়াদ বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। তবে তা কয়দিন পর্যন্ত বাড়বে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
১৯ এপ্রিল, ২০২১।
