চাঁদপুরে জাতীয় বীমা দিবস পালিত

সোনার বাংলা বিনির্মাণে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন
………… মো. মাজেদুর রহমান খান



শাহ আলম খান
চাঁদপুরে জাতীয় বীমা দিবস উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ১০টায় চাঁদপুর হাসান আলী স্কুল মাঠ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এসএম জাকারিয়া ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. জাহেদ পারভেজ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের হয়ে আউটার স্টেডিয়ামে এসে শেষ হয়।
চাঁদপুর আউটার স্টেডিয়ামে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, আমার চাকরি জীবনের প্রথমে জীবন বীমা কর্পোরেশনের প্রধান কার্যালয়ে এ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছি। তখন চাকরির বাজারে আমরা ভালো লেভেলের চাকরি খুঁজছি। আমি একসাথে কয়েকটি চাকরি পেয়েছি। আজ আপনাদের বক্তব্য শুনে আমার কাছে ভালো লেগেছে। আমি বলতে চাই, আপনারা এমন কিছু করেন, এমন কিছু দেখান, যাতে করে সচেতন যারা আছে, তারা তাদের সবকিছুর সাথে একটিকে কমন রাখবে, অর্থাৎ আমার বীমা আছে। সেই কাজটি কিন্তু এখনো হয়নি। আপনাদের বক্তব্য থেকেই আমি জানতে পেরেছি।
তিনি আরো বলেন, আজ আপনি একজন মানুষকে জিজ্ঞাসা করেন ব্যাংক একাউন্ট আছে কার-কার। যার পকেটে টাকা আছে, তারই ব্যাংক একাউন্ট আছে। টাকার পরিমাণ যখন বেশি হয়ে যায়, তখন সে মনে করে টাকা পকেটে রাখা নিরাপদ নয়, তখনেই ব্যাংকে রাখে। যখন বাজারে বিকাশ আসলো, তখন কত শতাংশ দখল করেছে কল্পনা করা যাবে না। ভালোর সাথে সাথে মন্দও দখল করেছে। অনেক সন্ত্রাসী বিকাশকে তার অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করছে। কোটি কোটি টাকা বিকাশে চলে গেছে। কারণ এত সহজ ব্যাংকি দেশে চলে আসছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। বাংলাদেশের মানুষের হাতে এখন প্রচুর টাকা, প্রচুর সম্পদ জড়ো হয়েছে। মানুষের যখন টাকা বেড়ে যায়, তখন ব্যাংকে রাখে। যখন সে বুঝে ব্যাংকে টাকা অলস পড়ে আছে, তখন সে অন্য উপকরণ খুঁজে।
জেলা প্রশাসক উদাহরণস্বরূপ বলেন, যে কোন একটি পরিবারের দিকে লক্ষ্য করুন একটি পরিবার এক সময় ঢেকিতে চাল মাড়াই করে ভাত খেতো। সে এখন প্যাকেটের চাল কিনে। যে আগে গম কিনে ভাঙিয়ে বাড়িতে আটা রেখে রুটি বানিয়ে খেতো, সে এখন প্যাকেট ময়দা কিনে খায়। এই চাঁদপুর শহরে আপনি এখন কোথাও গম খুঁজে পাবেন না। কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। তাদের হাতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ থাকার কারণে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কষ্ট করে খেতে চায় না। লাল চাল এখন আর বাজারে পাওয়া যায় না। এখন সব বিদেশি পণ্য দেশে চলে আসছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সকল ক্ষেত্রে আধুনিকতা চলে আসছে। পণ্যের দোকানগুলোতে গেলেই দেখা যায় অবস্থা। আমাদের দেশের তৈরী পণ্যগুলো তেমন চোখে পড়ে না। যার কারণে আমাদের দেশের টাকাগুলো বিদেশে চলে যাচ্ছে। চীনই আমাদের দেশের বাজার দখল করে আছে। তবে এখন ভাইরাসের কারণে আমদানি বন্ধ রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশ থেকে রপ্তানি তেমন একটা নেই।
জেলা প্রশাসক বলেন, মানুষের প্রচুর অর্থগুলো কেন হুন্ডি হয়ে ইউরোপ আমেরিকায় চলে যাচ্ছে। কেন আপনাদের কাছে আসছে না। এটিই হচ্ছে আমার প্রশ্ন। এই প্রশ্ন আমার অনেক দিনের। আমি এইসব কথাগুলো জীবন বীমা কর্পোরেশনের চোরম্যানকেও বলেছি। আপনাদের নতুন আইডিয়া কোথায়, আপনাদের বিকাশ কোথায়। একজন ভিক্ষুকেরও অনেক আয়। সে প্রতিদিন ২০ টাকা করে সঞ্চয় করতে চায়। আমি যশোরে ভিক্ষুকদের নিয়ে কাজ করেছি। একজন ভিক্ষুককে যখন ৬শ’ টাকা দিয়ে বাদাম কিনে দিলাম, তারপর থেকে সে প্রতিদিন ১ হাজার টাকা আয় করে। রাস্তার টোকাই, সে বলছে স্যার আমি যদি ১০ বছরও বাঁচি, তাহলেও আমি হাজার হাজার টাকা সঞ্চয় করতে পারি। আমার টাকা কোথায় রাখবো। বাবা তো সব টাকা নিয়ে যায়। আমি তো প্রতিদিন ১০-৩০ টাকা সঞ্চয় করতে চাই। আমি তাকে একটি ব্যাংক দেখিয়ে দিলাম। তার ৩ তলা ভবনে গিয়ে সঞ্চয় করার মত সময় নেই। সে তার খুবই কাছে সঞ্চয় করতে চায়।
মাজেদুর রহমান খান বলেন, আমি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রস্তাব করেছি যে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করেন, যা খুব সহজেই সঞ্চয় করা যায় এবং টাকাটা নিরাপদ থাকে। সেটি হতে পারে প্রাইজবন্ড বা তার মতো অন্য কিছু। কেউ রাজী হলো না। আমি বলবো আপনারা চালু করেন। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি এটি খুবই চলবে। মানুষের হাতে প্রচুর টাকা আছে, টাকা রাখার জায়গা পাচ্ছে না। এখানে আজ অনেক শিক্ষার্থী এসেছে কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে। কারণ তাদের মেধা আছে, মেধা দিয়ে পুরস্কার নিয়ে যাবে। কিন্তু আপনি বীমা কর্মী হওয়ার জন্য আহ্বান করেছেন, কেউ আসে না। আপনার ডাকেও সাড়া দিবে, তবে আপনি পথ দেখাতে হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ১ দিন আগে একজন বাবা এসেছেন, তিনি মাদ্রাসায় চাকরি করেন- সামান্য বেতনে। তিনি তার মেয়েকে মাগুড়া মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়েছেন ১০-২০ হাজার টাকা লাগবে। তাকে যদি আপনি এমন কোন পলিসি দিতে পারেন, যে সে মেডিকেল পাস করবে এবং চাকরি পাবে তারপর সে আমার টাকা ফেরৎ দিবে। মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে এটিই তার গ্যারান্টি। তাকে আপনি প্রতি মাসে মাসে টাকা দিবেন। আপনি ওই বাবার সাথে ত্রি-পক্ষীয় চুক্তি করবেন। এ ধরনের কাজে কিন্তু আপনারা যান না।
তিনি বলেন, চাঁদপুর জেলার বহু মাদ্রাসা ও স্কুলের ছাত্র পাস করে আইন বিষয়, মেডিকেল এবং অন্যান্য বিষয়ে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু তাদের পড়ার জন্য টাকা নেই। তাদের জন্য আপনারা কোন নতুন পদ্ধতি চালু করুন। এসব কথায় আমার উদ্দেশ্যে হচ্ছে একটাই। এই সোনার বাংলা বিনির্মাণে সবার ভাগ ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এই অংশগ্রহণের জন্য বিজ্ঞাপন বক্তৃতা নয়, দরকার হচ্ছে সত্যিকারের মননশীল মানুষ। দেশপ্রেম নিয়ে আপনাকে এগিয়ে আসতে হবে।
আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, এমন কিছু নিয়ে আসুন, যাতে মানুষ বীমাকে প্রথম হিসেবে গ্রহণ করবে। সরকার আইন করে দিয়েছে। কিন্তু সব সময় আইন প্রয়োজন হয় না। আপনারা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা খুঁজেন। দেখবেন আপনাদের কাছে কোটি কোটি মানুষ আসবে। আসুন কোন নেগিটিভে নয়, প্রজেটিভে থাকি। নতুন কিছু তৈরী করুন যাতে চাঁদপুরকে মানুষ মডেল হিসেবে নেয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এসএম জাকারিয়ার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন মেঘনা লাইফের ইনচার্জ কবির হোসেন বকাউল, ডেলটা লাইফের ইনচার্জ কে এম লোকমান হোসেন, ন্যাশনাল লাইফের ইনচার্জ মো. মোকাররম মজুমদার, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ইনচার্জ মো. আজাদ হোসেন, জীবন বীমা কর্পোরেশনের ম্যানেজার জামিলুর রহমান, পপুলার লাইফ এর জেলা সমন্বয়কারী মো. দেলোয়ার হোসেন উজ্জল, মেট লাইফ আলিকোর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার রো. মো. মাকসুদুর রহমান প্রমুখ।
আলোচনা সভার শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করেন পপুলার ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তা মাও. মো. সফিকুর রহমান, গীতা পাঠ করেন ডেল্টা লাইফের কর্মকর্তা বাসু দেব রায়।
এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বিজয়ী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের হাতে প্রধান অতিথি পুরস্কার তুলে দেন।