চাঁদপুরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার!

এসএম চিশতী
প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা না থাকায়, চাঁদপুর জেলায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার! এমনটাই মনে করছেন এ জেলার সচেতন মহল।
এছাড়া সরেজমিনে দেখা যায়, চাঁদপুর জেলার সব কয়টি উপজেলায় নিষিদ্ধ পলিব্যাগে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। ছোট-বড় সব দোকানেই এখন আবার সে আশির দশকের মতোই পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার শুরু হয়েছে। পলিথিনের এমন যথেচ্ছ ব্যবহারে পুরো জেলার পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে! চাঁদপুর সদর উপজেলাসহ, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর, কচুয়া, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ সব কয়টি উপজেলাতেই এ নিষিদ্ধ পলিব্যাগে বাজার সয়লাব!
একটি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, এই পলিথিন ব্যাগ পাইকারী বিক্রি হয় চাঁদপুর পুরাণবাজারে। আর সেখান থেকেই বেশ কিছু পাইকার রমরমা ব্যবসার লোভে এই নিষিদ্ধ পলিথিন খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে কঠোর গোপনীয়তায় পৌঁছিয়ে থাকেন। তবে খুচরা বিক্রেতারা গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই প্রশাসনের নাকে ডগায় প্রতিনিয়তই এ নিষিদ্ধ পলিব্যাগ বিক্রি করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুরাণবাজারের বাসিন্দা একজন পাটকল কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে, পুরাণবাজারসহ জেলার সব কয়টি উপজেলার অসাধু ব্যবসায়ীরা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই পলিব্যাগের জমজমাট ব্যবসা করে আসছেন। অথচ এ নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ বিক্রি বন্ধে প্রশাসন এবং চেম্বার নেতাদের চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, তাদের নীরবতার কারণেই মূলত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ জেনেও অসাধু ব্যবসায়ীরা এ নিষিদ্ধ পণ্য পলিব্যাগ খোলা বাজারে অহরহ বিক্রি করার সাহস পাচ্ছে।
চাঁদপুর জেলা পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের নেতা শিহাবদ্দীন সেলিম বলেন, আশির দশকের শেষের দিকে এবং নব্বই দশকের শুরুর দিকে যেমন সারাদেশের বাজার পলিথিন ব্যাগে সয়লাব হয়ে গিয়েছিলো। বর্তমানেও সারাদেশেই সে একই চিত্র দেখতে পাচ্ছি। তবে আমাদের ব্র্যান্ডিং জেলা চাঁদপুরে এ নিষিদ্ধ পলিব্যাগের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া দুঃখজনক বলে মনে করি। মানুষ কাঁচাবাজার ছাড়াও যে কোনো মুদি পণ্য এই পলিথিন ব্যাগে সে আগের মতোই বহন করা শুরু করেছে। নিষিদ্ধ পলিব্যাগ ব্যবহার যে হারে বেড়ে চলছে এবং খোলা বাজারে আহরহ বিক্রি হচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে ব্র্যান্ডিং জেলা চাঁদপুরের ঐতিহ্য নষ্ট হওয়ার পাশাপশি এ জেলার পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই এ নিষিদ্ধ পলিব্যাগ বহন এবং বিক্রি বন্ধে দৈনিক ইল্শেপাড়ের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, ১৯৯১ সালে গঠিত বিএনপি সরকারের তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী শাহজাহান সিরাজ প্রথম পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে উদ্যোগ নেন এবং তার নেয়া উদ্যোগেই মহান জাতীয় সংসদে পলিব্যাগ নিষিদ্ধ আইন পাস হয়। ঐ আইনেই বলা আছে, নিষিদ্ধ পণ্য পলিব্যাগ বিক্রি, প্রদর্শন, উৎপাদন, মজুদকরণ অথবা বিক্রির উদ্দেশে পরিবহন করা হলে প্রথমবারের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ঐ অপরাধীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আর একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এই অপরাধে অভিযুক্ত হলে তাকে সর্বনিম্ন এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে এবং একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এই অপরাধে অভিযুক্ত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি অপরাধ অনুযায়ী আদালত স্থির করবে।
সরকার কঠোরভাবে এ আইন প্রয়োগ করায় আস্তে-আস্তে এই পলিব্যাগ ব্যবহার কমতে থাকে। এক পর্যায়ে পলিব্যাগ ব্যবহার বন্ধ হয়ে আসে। ধীরে-ধীরে মানুষও বিকল্প হিসেবে কাপড় ও পাটের ব্যাগ ব্যবহার করতে শুরু করে। সে থেকে অনেক বছর দেশে পলিব্যাগ ব্যবহার বন্ধ ছিলো। তবে বর্তমানে সে আগের মতোই সর্বত্র আবার পলিব্যাগ ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতি কারক পলিব্যাগ যা আগুনে পোড়ানো ছাড়া অন্য কোনোভাবেই নষ্ট করা যায় না। অথচ চাঁদপুর জেলায় এখন আর গোপন কিছু নেই, প্রকাশ্যে সব ধরনের দোকানেই এ নিষিদ্ধ পলিথিনের বিক্রি চলছে!
এ বিষয়ে কথা হয় চাঁদপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার সাথে। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ পলিব্যাগ বিক্রি এবং ব্যবহার বন্ধে মাঝে-মাঝেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়। তবে সুযোগ বুঝে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ অপকর্ম করে আসছে। তারা প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। যে কোনো সময় সেসব অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি আরো বলেন, সরকারের পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে মারাত্মক ক্ষতিকর নিষিদ্ধ পলিব্যাগ বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
তবে ব্র্যান্ডিং জেলা চাঁদপুরের ঐতিহ্য রক্ষায় মারাত্মক ক্ষতিকর নিষিদ্ধ পলিব্যাগ বন্ধে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করবেন এমন প্রত্যাশাই করেন জেলার সচেতন মানুষরা।
৩১ জানুয়ারি, ২০২১।