চাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় স্মৃতিচারণ

স্টাফ রিপোর্টার
‘এসো মিলি মুক্তির মোহনায়’ স্লোগানে ২৮তম মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় গতকাল রোববার স্মৃতিচারণ পরিষদের ব্যবস্থাপনায় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্মৃতিচারণ পরিষদের সদস্য সচিব মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব মাস্টারের সভাপতিত্বে ও সাংস্কৃতিক পরিষদের আহ্বায়ক তপন সরকারের পরিচালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে স্মৃতিচারণ করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জীবন কানাই দাস।
তিনি তার বক্তব্যে বলেন, আমি স্মরণ করছি জাতির পিতা ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যার নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের আমি সম্মান জানাই। চাঁদপুর আমার জন্মভূমি। বাংলাদেশী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি। বিদেশীদের কাছে পরিচয় দিলে আমি বলি আমার বাড়ি চাঁদপুরে। ২৭ বছর ধরে সহযোদ্ধারা এমন একটি বিজয় মেলা অনুষ্ঠান করে যাচ্ছে আজকে এসে নিজেকে গর্ববোধ মনে করছি। আমার অনেক বন্ধু এ মেলায় আসতে বলেছিল। আজকে আসলাম। অনেক বন্ধু আজ নেই। বাংলাদেশের কোন জেলাতে এমন মেলার আয়োজন করা হয় না। বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী পালন করছে। ১৯৮০ সালে মালয়েশিয়া ছিলাম। পাকিস্তানি এক জেনারেলের স্বাক্ষাতকার নিতে চিলাম। তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন তোমার দেশ কোথায়। আমি বলেছিলাম বাংলাদেশ। বললাম ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের হেডকোয়ার্টার যেখানে ছিল সেখানে আমার বাড়ি, তার গায়ে কাটা দিল। চাঁদপুর মানে সংগ্রামের জায়গা। সর্বনাশা মেঘনা নদী আমাদের শিখিয়েছে সংগ্রাম করে কিভাবে বাঁচতে হয়। যুদ্ধের সময় ৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে আসি। ৭ এপ্রিল বাড়ি যাব ভেবে বেরিয়েছিলাম। পুরাণবাজারের মতিসল্টের বাসায় যাই। ঠিক ৯টা ৩৫মিনিট এসময় পাকিস্তানি ২টি বিমান আসল। চাঁদপুর শহর লন্ডভন্ড হয়ে গেল। ওই দিন চাঁদপুর ছেড়ে চলে যাই। বাড়ি না গিয়ে চলে যাই আগরতলায়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ৩নং সেক্টরে যুদ্ধ করার। সিংহারপুরে যুদ্ধ করলাম। ৪ মাস যুদ্ধ করার পর আমাদেরকে সেনাবাহিনীর ট্রেনিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে। মুক্তিযুদ্ধে হাইমচরে কোন ক্ষতি করতে পারল না। ৩নং সেক্টরে যখন যুদ্ধ করি সেটাছিল স্মাগলার এলাকা। স্মাগলাররা নিরবে চলত। যুদ্ধের সময় তারা আমাদেরকে সহযোগিতা করেছে। দেশ স্বাধীনের পর তারা আবার স্মাগলারগিরিতে ছুটে যায়। চাঁদপুরের বাখরপুর মজুমদার বাড়িতে গাটি করল। পাকিস্তানিরা আক্রমণ করে অনেক ক্ষতি করেছে। ওই এলাকার নুরু চোরা নামে এক লোক ছিল। সে কোথায় চুরি করত কেউ তা বলতে পারত না। তার কাছ থেকে আমি একটি ঘড়ি কিনেছিলাম। একদিন বাড়ি গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম নুরা চোরা কই। মা বলেছিল মজুমদার বাড়ির যুদ্ধে সে মারা গিয়েছে। এমনিভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মহান মুক্তিযুদেধ জীবন দিয়েছিল। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরের যুদ্ধ আজও স্মরণীয়। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ভারতীয় কোন অস্ত্র ছিল না। তখন আগস্ট মাস খবর আসে পাকিস্তানীদের ৭টি অস্ত্র ও তেলবাহী জাহাজ নারায়নগঞ্জ থেকে ভুয়াপুর দিয়ে সিরাজগঞ্জ যাবে। পাকিস্তানিরা এ পথ বেছে নিয়েছিল রেললাইন ও সড়ক পথ কেটে দেওয়ার কারণে। সন্দ্বীপের মোস্তফা একটি জাহাজের সারেং ছিল। তার ভাই যুদ্ধে যাওয়ায় পাকিস্তানিরা তার ভাইকে মেরে ফেলেছে। তখন ইপিআরের সেনা ছিল তাকে খবর দেওয়া হয় এই যুদ্ধ জাহাজের। ৯ আগস্ট ভুয়াপুরে মাটি কাটা বাজারে ৭টি জাহাজ এসে ফিরল। মোস্তফা ইলিশ মাছ কেনার নাম করে কাগজে লিখে পাকিস্তানি জাহাজের কথা মুক্তিযোদ্ধাদের জানিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা হাবিব তার কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে সে ব্যাংকার করে পজিশন নেয়। ১১ আগস্ট দুপুর ১২টায় বাজার সাথে সাথে হাবিব গুলি শুরু করে। পাকিস্তানিরা মারা যায় এবং কেউ পালিয়ে যায়। ২ সারেং এর ডাক চিৎকারে মুক্তিযোদ্ধারা নৌকা নিয়ে ওই জাহাজে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে ৫০ এর অধিক পাকিস্তানি সেনা মারা গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা ১৭টি নৌকায় অস্ত্র গোলা বারুদ নিয়ে টাঙ্গাইলের জঙ্গলে পালালো। এ যুদ্ধের নাম হলো মাটি কাটার জাহাজমারার যুদ্ধ।
শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিজয় মেলার চেয়ারম্যান অ্যাড. বদিউজ্জামান কিরন। অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা প্রদান করেন মেলার মহাসচিব হারুন আল রশীদ।
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তমাল কুমার ঘোষ, লেখক হাসান আলী, মুক্তিযোদ্ধা মহসিন পাঠান ও সানাউল্লাহ খান।