চাঁদপুর শহরে আবারো কিশোর গ্যাংয়ে উৎপাত

 

শাহ্ আলম খান
চাঁদপুর শহরে আবারো কিশোর গ্যাংয়ে উৎপাতে অতিষ্ট হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতা, অল্প বয়সে মাদকের সাথে জড়ানো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখা পোস্ট, টিক্টকসহ মোবাইলে অনলাইনভিত্তিক এ্যাপস ও গেমস ব্যবহার, নারীসহ নানা কারণে এই গ্যাংয়ের সৃষ্টি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী অনেক অভিভাবক।
তবে চাঁদপুর শহরে কিশোর গ্যাংয়ের নানা চক্র ধরার জন্য দিন-রাত পাড়া মহল্লাসহ বিভিন্নস্থানে অভিযান করেছেন চাঁদপুর সদর মডেল থানার ওসি মো. নাসিম উদ্দিন। প্রায় কয়েকশ’ এই চক্রের সদস্য আটকও করেন তিনি। চাঁদপুর শহরের মানুষ ওসি মো. নাসিম উদ্দিনকে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় অভিযানে গেলে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বন্ধ করায় ধন্যবাদ জানান। কিন্তু কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই চক্রের সদস্যরা।
এলাকার সচেতন লোকেরা জানান, তাদের (ঐসব কিশোর) ডাক দিলে হামলা ও নাজেহাল হতে হয়। তারা নতুন করে আবার সক্রিয় হচ্ছে। শহরের গাজী সড়ক, ট্রাকরোড, পালপাড়া, নিউ আলিম পাড়া, হকার্স মার্কেটের পিছনে, মুন্সেফ পাড়া, আবহাওয়া অফিসের পাশে, মিশন রোড ও রেললাইনের দক্ষিণ পাশের বালুর মাঠসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এ ধরনের কিশোর গ্যাং সদস্যদের আড্ডার চিত্র দেখা যায়।
একসঙ্গে আড্ডা। এরপর রাস্তায় নারী উত্ত্যক্ত, মাদক সেবন ও মানুষকে হয়রানি। একপর্যায়ে লোকজনকে মারধর, চুরি-ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, এমনকি খুনোখুনি। চাঁদপুর শহরে এভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে একশ্রেণির কিশোর ও তরুণ। আর তাদের পেছনে আছেন ‘বড় ভাইয়েরা’।
১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চাঁদপুর পৌরসভা। এর মধ্যে ‘সবচেয়ে অপরাধ প্রবণ’ এলাকা কোনটি সেটা এখনো চিহ্নিত করা যায়নি। পৌর এলাকায় কতটি কিশোর দল বা অপরাধী চক্র আছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই থানা পুলিশের কাছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রতিটি কিশোর দল বা বাহিনীর পেছনে আছেন এলাকার এক শ্রেণির ‘বড় ভাই’। তারা কোনো না কোনোভাবে স্থানীয় রাজনীতিতে যুক্ত। এই বড় ভাইদের অধীনে থাকে ১৫ থেকে ২২ বছর বয়সী কিশোর ও তরুণরা। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মানুষকে হয়রানি, মারধর বা রাজনৈতিক মিছিলে এসব কিশোর-তরুণকে ব্যবহার করেন তারা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব কিশোরের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের। কারো বাবা রিকশা বা ভ্যান চালান, আবার কারো বাবা চা বিক্রি করেন, আবার কারো মা-বাবা গৃহকর্মীর কাজ করেন। কিশোরদের কেউ স্কুল থেকে ঝরে পড়া, কেউবা স্কুলেই যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি একজন কর্মকর্তা বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশ কিশোরই বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসে শহরে ফ্যামিলি নিয়ে বাসা ভাড়া থাকে। তারা বেকার থাকায় যে কেউ এসব কিশোরকে দিয়ে সহজেই অপরাধ করাতে পারছে।
এদিকে মিশন রোডস্থ শাহী জামে মসজিদের দক্ষিণে রেললাইনের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে পাটওয়ারী বাড়ি সংলগ্ন বালুর মাঠে আড্ডা দেন কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্য। ৪ থেকে ৫ জন এক গ্রুপ, ৭/১০ জন এক গ্রুপ, আবার ১৫ থেকে ২০ জনেক গ্রুপ বসে আছে মাঠের বিভিন্ন স্থানে এবং রেললাইন উপরে।
এর মধ্যে একজন কিশোর গ্যাং সদস্য বয়স (১৬) কে অনুসরণ করে তার পিছনে পিছনে তার এলাকায় যাওয়া হয় এ প্রতিবেদকের। এলাকায় গিয়ে কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানা যায় তার বাবা ভ্যান চালক। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা দেখা মিললো তার বাবা ভ্যান চালকের। তিনি ভ্যান নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি শহরের বিভিন্ন স্থানে ভ্যান চালান। যখন যে ধরনের ভাড়া পান সেই ভাড়া নিয়ে ছুটে যান শহরের বিভিন্ন জায়গায়। অভাবের সংসার, খোঁজ খবর রাখার মতন সময় থাকে না তার।
তিনি বলেন, আমার ছেলে ভালো ছিল। জেএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর একদিন স্কুলের এক শিক্ষকের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। পরে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপরে সঙ্গদোষে বখাটেপনার দিকে চলে যায়।
কয়েকজন সচেতন নাগরিক বলেন, ঘনবসতি হয়ে উঠেছে চাঁদপুর শহর। কিছুদিন কিশোর গ্যাং সদস্যরা নিষ্ক্রিয় ছিলো। নিষ্ক্রিয় থাকার পর হঠাৎ করে আবার পাড়া-মহল্লায়, রাস্তাঘাটে, চায়ের দোকানে, বাসাবাড়ির রাস্তার অলিগলিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তারা। তারা বাসাবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হল্লা করে, আজেবাজে কথা বলে, হিন্দি গান করে, সিগারেট-গাঁজা, এমনকি ইয়াবাও সেবন করে। তাদের কখনো ডাক দিলে হামলা ও নাজেহাল হতে হয়। পরবর্তীতে ইজ্জতের ভয়ে তাদের কেউ কিছু বলা হয় না। মাথা নিচু করে চলে যেতে হয়। কিছু করার নেই।
সচেতন নাগরিকরা আরো বলেন, অপরাধ প্রবণতাও অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে বেশি। অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা কোনো না কোনো বড় ভাইয়ের মদদপুষ্ট। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সুশীল সমাজ বলেন, এসব বড় ভাইরা তাদের প্রশ্রয় বন্ধ করতে না পারলে এক সময় তাদের বড় ধরনের মাশুল দিতে হবে এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ না হলে এসব অপরাধী চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
বালুর মাঠের পাশে থাকা পাটওয়ারী বাড়ি ও আশে পাশের বাসা বাড়ির নারী পুরুষরা জানান, কিশোর গ্যাং বা তরুণরা ৬/৭ জন করে ভাগে ভাগে আসেন মাঠে। কারো সাথে আবার উঠতি বয়সে মেয়েরাও থাকেন বোরকা পরে। এইতো ক’দিন আগে মেয়ে নিয়ে কথা কাটা-কাটি হলে দুই গ্রুপের মধ্যে কয়েক দফা মারামারিও হয়। সেই মারামারি কয়েকদিন ধরে চলতে থাকে।
এলাকাবাসী আরো জানান, ১৪ /১৫ বছর বয়সের ছেলেদের থেকে শুরু করে ২০/২২ বছরে ছেলেরা এসে এই বালুর মাঠে আড্ডা দেয়। সকাল থেকে শুরু করে রাতে পর্যন্ত চলে তাদের চিল্লা-চিল্লি। তারা কারো কথা শুনে না। তাদের আচরণ অনেক খারাপ। কয়েকবার মডেল থানাকে ফোনকে জানানো হলে ওসি মো. নাসিম উদ্দিন নিজে ফোর্স নিয়ে বালুর মাঠে হানা দেন। এভাবে কয়েকদিন সকাল-বিকাল এবং সন্ধ্যার পরে বালুর মাঠে পুলিশ আসার পর তাদের আড্ডা কমে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে গত এক সপ্তাহ ধরে আবার ছেলে-মেয়ের আড্ডা বেড়ে যাচ্ছে।
১৭ জানুয়ারি, ২০২১।