নদী রক্ষা না করা গেলে দেশকে সুন্দর ও নান্দনিক করা যাবে না
শাহ্ আলম খান
কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার ডাকাতিয়া নদী পুনঃখননের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উপর মতবিনিময় কর্মশালার প্রধান অতিথি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ফজলুর রশিদ বলেন, নদী হলো বাংলাদেশের প্রাণ। নদী হলো শরীরের ভিতর শিরা-উপশিরার মত। শিরা-উপশিরা ঠিক না থাকলে যেমন হার্ট অ্যাটাক হয়, ঠিক তেমনই নদীকে রক্ষা না করা গেলে বাংলাদেশকে সুন্দর ও নান্দনিক করা যাবে না।
বুধবার (৯ ডিসেম্বর) সকাল ১১টায় চাঁদপুর জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার নতুন ডাকিতিয়া নদী পুনঃখননের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উপর মতবিনিময় কর্মশালা তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, নদী দূষণ হচ্ছে। আমরা নিজেরাই অনেকভাবে নদী দূষণ করছি। নদী দূষণমুক্ত করতেই হবে। সর্বোপরি আমাদের যে পরিকল্পনা হচ্ছে তা মহৎ একটি পরিকল্পনা। ২০৪১ সালে যে বাংলাদেশ দেখার স্বপ্ন রয়েছে, তা যেন শুধুমাত্র স্বপ্নই না থাকে, বাস্তবেও রূপান্তরিত করতে হবে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান। তিনি বলেন, পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়া নদী হলো চাঁদপুরের প্রাণ। তবে ডাকাতিয়া নদীটি অবৈধ স্থাপনার কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সেইসব অবৈধ স্থাপনাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আরো বলেন, নদীর পাড়কে সুন্দর এবং নান্দনিক করতে হলে সুপরিকল্পনার প্রয়োজন। এমন পরিকল্পনা করেন যা মানুষ ভালোবাসে। উন্নয়ন করতে কোন বাধা নেই এবং থাকবে না।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র অ্যাড. জিল্লুর রহমান জুয়েল। তিনি বলেন, চাঁদপুর শহরকে সুন্দর ও নান্দনিক করার জন্য নদীকে রক্ষা করতে হবে। নদীর দু’পাশ রক্ষায় বাইপাস সড়ক করা যেতে পারে। নদীর দু’পাশ অবৈধ স্থাপনা মুক্ত করতে বাইপাস সড়কের প্রয়োজন। বাইপাস সড়ক হলে অবৈধ দখল বা স্থাপনা থেকে চিরতরে মুক্ত হতে পারবো। বাইপাস সড়ক করতে পারলে সেটা আমাদের একটা বড় অর্জন হবে। এছাড়া নদীর মধ্যে চর রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ড্রেজিং করাটা খুব বেশি দরকার হয়ে পরেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসোসিয়েট স্পেশালিস্ট আসাদুল কবির চৌধুরীর পরিচালনায় আরো বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্বাঞ্চল) জহির উদ্দিন আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান, চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অসিত চন্দ্র বনিক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা প্রমুখ।
এসময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কর্মশালার শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করেন মো. মনির হোসেন।
উল্লেখ্য, নতুন ডাকাতিয়া নদী কুমিল্লা জেলার টঙ্গীর পাড় হতে চাঁদপুর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১২২ কিলোমিটার। অতীতে এই নদী খুব সক্রিয় ছিল। শুকনো মৌসুমেও সেচের পানির প্রাপ্যতা ছিল এবং পথে মানুষ যাতায়াত করত। সাম্প্রতিক অতীতে, নদীর তীরে অবৈধভাবে বিভিন্ন অবকাঠামোর নির্মাণের কারণে নদীর তলদেশে পলি জমে এবং এর কারণে নদীর নাব্যতা হ্রাস পায় এবং নদীর তীরগুলো ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে নদী ভাঙন ত্বরান্বিত হচ্ছে। পুরাতন ডাকাতিয়া-নতুন ডাকাতিয়া নদী সেচ এ পানি নিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় নতুন ডাকাতিয়া নদীর চলমান পুনঃখনন কাজ পরিদর্শনকালে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নতুন ডাকাতিয়া নদী খননের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনতিবিলম্বে প্রকল্প প্রণয়ন করার নির্দেশ দেন। সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংকে নিয়োগ প্রদান করে। নতুন ডাকাতিয়া নদীর প্রকল্প এলাকা প্রায় ৫৬৮ বর্গ কিলোমিটার। এটি কুমিল্লা জেলার সদর, চৌদ্দগ্রাম ও লাকসাম উপজেলা এবং চাঁদপুর জেলার সদর, ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলা অবস্থিত।
নতুন ডাকাতিয়া নদীর প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কাজসমূহ হলো- নতুন ডাকাতিয়া নদী পুনঃখনন, খননকৃত মাটি ব্যবস্থাপনা, নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে এমন ব্রিজ চিহ্নিত করে তদস্থলে নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা এবং নদীর তীর সংরক্ষণ করা। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যসমূহ- এই এলাকার বন্যা ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতার সমস্যা দূর করা, নদীর তীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, শুকনো মৌসুমে পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, নৌ চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধি করা, মৎস্য সম্পদের নিরাপদ ও টেকসই অভয়ারণ্য নিশ্চিত করা, বর্তমান কৃষি পরিস্থিতি মূল্যায়ন সম্ভাব্য উন্নয়নের জন্য পরামর্শ প্রদান করা এবং অর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত অব্যবস্থা সমীক্ষা করা।
১০ ডিসেম্বর, ২০২০।
