
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব-৪
নদী থেকে কিছু প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যেই অদৃশ্য বা হারিয়ে গেছে…
নদী তীরবর্তী এলাকার বনায়নে রয়েছে বড় ধরনের হুমকি…
মাহবুবুর রহমান সুমন
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির উচ্চতা বৃদ্ধিতে দেশের নদ-নদীগুলোর মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। যার ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে সমুদ্রের পানি ঢুকে লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। বর্তমানে এ সমস্যার সমাধান কিংবা বিকল্প উপায় খুঁজে বের করতে না পারলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে মাছের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে বলে মৎস্য গবেষকরা দাবি করছে।
এদিকে চাঁদপুর মেঘনায় লবণাক্ততায় কতটা হুমকি অপেক্ষা করছে এমন এক মৎস্য গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর উন্মুক্ত জলাশয়ে লবণাক্ততার পরিমাণ দুই থেকে সাত পিপিটি (পানির লবণাক্ততা পরিমাপক)। পানিতে দ্রুত লবণাক্ততায় পরিবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যার কারণে মাছের জীবন প্রণালীতে বড় ধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা মিঠা পানির মাছ উৎপাদনের জন্য হুমকি হিসেবেই দেখছে সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ও সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়ফা আহমেদের নেতৃত্বে চলমান Effect of climate change on the Ecology and Biodiversity of Inland open water fishes ৫ বছর মেয়াদী এক গবেষণার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নদীতে জলবায়ু সংক্রান্ত বাস্তুতন্ত্র প্রভাব পড়ছে। গবেষণায় মাছের জীব বৈচিত্র্যসহ মেঘনা নদী ও তেতুলিয়া দুই নদীতে সমুদ্রের পানির অনুপ্রবেশের প্রভাবে লবণাক্ততার বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। ফলে দেখা গেছে নদীর মাছের বাস্তুসংস্থানসহ নদীর জীব বৈচিত্র্যের উপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।
গবেষকরা আশা করছে, এ গবেষণাটি আগামি ২০২০ সাল নাগাদ শেষ করা সম্ভব হবে। তখন ক্ষয়ক্ষতির বাস্তবিক চিত্র অনেকটাই বেরিয়ে আসবে বলে তারা দাবি করছে। তারা বর্তমানে শুকনো (মার্চ-এপ্রিল) মৌসুমে মেঘনা নদীর চর-লুধুয়া থেকে চর-আলেকজান্ডার পর্যন্ত নিয়মিত লবণাক্ততার পরিমাণ এক থেকে দুই পিপিটি বিদ্যমান থাকতে দেখেছে।
এছাড়া ধারাবাহিকভাবে মেঘনার ষাটনল, চাঁদপুর, হরিণাঘাট, চরভৈরবী, চর-লুধুয়া, চর-আলেকজান্ডার, রামগতি, হিজলা, কালীগঞ্জ, হিলশাঘাট, ডুলিয়া ও কালিয়া পর্যন্ত পানিতে লবণাক্ত পরীক্ষা চালিয়েছে। পরে গবেষণার ফলাফল আলাদাভাবে দুই নদীর পানিতে রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ, তাপমাত্রা, স্বচ্ছতা, লবণাক্ততা, দ্রবীভূত অক্সিজেন, কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা ও ক্ষারত্ব রেকর্ড দেখেন। ঐ রেকর্ডে দেখা গেছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব না হলে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে নদীমাতৃক বাংলাদেশে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ এমন চিরাচয়িত প্রবাদও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেখা গেছে, দেশের সব নদীগুলোর সাথেই অসংখ্য খাল, বিল ও হাওর-বাওর, ডোবা, নালার সংযোগ থাকায় মিঠা পানির মাছ হিসেবে বাংলাদের মাছ খুব সমৃদ্ধ দেশ এবং বিদেশে।
দেশের মৎস্য গবেষণার পরিসংখ্যান মতে, বর্তমানে বৃহত্তর নদীগুলোতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মিঠা পানির প্রায় ৫৪ প্রজাতির মাছ হুমকির মুখে। তার মধ্যে ১২ প্রজাতির মাছ ভয়ঙ্কর বিপদাপন্ন এবং ২৮ প্রজাতির মাছ বিপদাপন্ন হিসেবে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।
তবে দেশের মৎস্য অধিদপ্তরের সূত্রমতে, দেশে জনপ্রতি বার্ষিক মাছের চাহিদা ১৮ কেজি। যা থেকে তাদের আমিষের ৫৮ শতাংশ পূরণ করে থাকে এই মাছ। তাই বছরে মাছের উৎস হিসেবে তারা দেখিয়েছে গড়ে উন্মুক্ত (নদী) জলাশয় থেকে আহরিত হয় ১০ লাখ ৬০ হাজার ১শ’ ৮১ মেট্রিক টন, বদ্ধ জলাশয় (চাষকৃত) থেকে ১০ লাখ ৫ হাজার ৫শ’ ৪২ মেট্রিক টন এবং সমুদ্র থেকে আসে ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫শ’ ৭৩ মেট্রিক টন মাছ। এখন নদীর পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উন্মুক্ত জলাশয়ের ১০ লাখ ৬০ হাজার ১শ’ ৮১ মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন অনেকটাই হুমকির সম্মুখীন।
গবেষণায় দু’টি নদীতে মাছের প্রাপ্যতার সাক্ষাৎ হয় মাছ ধরার এবং সংগ্রহের মাধ্যমে। সংগৃহীত হওয়া ঐ মাছের বাজার গবেষণায় ২৪টি মাছ প্রজাতি মেঘনা নদীর নির্বাচিত স্থানগুলোতে পাওয়া গেছে এবং ১৮টি তেতুলিয়া নদীতে। পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে, ধারণা করা হয়েছে নদী থেকে কিছু প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যেই অদৃশ্য বা হারিয়ে গেছে।
গবেষকদের এই রেকর্ডে সতর্কবার্তাই অপেক্ষা করছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছে। যা দেশের অর্থনীতিতে অগ্রসরমান মৎস্য খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখনই যদি তা নিয়ন্ত্রণ পর্যায়ে রাখা না যায় তাহলে মাছ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও করছেন গবেষকরা।
তাছাড়া নদীর গতি প্রকৃতির সাথে মাছের জীবন প্রণালী যেমন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে ঠিক, তেমনি নদীর অন্যান্য জীব বৈচিত্র্যও হুমকিতে থাকছে। পাশাপাশি দেশের কৃষি উৎপাদনেও অনেকাংশে প্রভাব পড়বে অতি শীঘ্রই। এছাড়া নদী তীরবর্তী এলাকার বনায়নে (ছোট-বড় ও মাঝারী গাছ) রয়েছে বড় ধরনের প্রভাব বা হুমকি।
গবেষকরা আরো জানান, বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরো বাংলাদেশকেই অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বর্তমানে ঝুঁকির অন্যতম হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর মিঠা পানির প্রবাহ কমে আসা। ফলে বাংলাদেশের সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের মাটি ও নদ-নদীতে সমুদ্রের পানি ঢুকে লবণাক্ততায় ধীরে ধীরে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে।
এ সমস্যার সমাধান অথবা এর সাথে খাপ খাওয়ানোর উপায় খুঁজে বের করা সম্ভব না হলে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বও থাকবে হুমকিতে। ফলে চলমান গবেষণা শেষে চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে মিঠা পানির মাছ সংরক্ষেণের উপায় বা বিকল্প নির্ধারণ করা অনেকটাই সহজ হবে। তবে কৃষি অর্থনীতি, মিঠা পানির উৎস, জীব-বৈচিত্র্যসহ পরিবেশগত অন্যান্য যে প্রভাব পড়বে তা রোধে এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অতীব জরুরি বা আবশ্যক বলে এই গবেষক ও সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়ফা আহমেদে জানিয়েছেন।
১৬ অক্টোবর, ২০১৯।
