নিরুত্তাপ চাঁদপুর পৌর নির্বাচন!

কাউন্সিলর প্রার্থীদের আগ্রহ কম

ইলশ্পোড় রিপোর্ট
আর মাত্র এক সপ্তাহ পর দেশের প্রথম শ্রেণির ও শতবর্ষী চাঁদপুর পৌরসভার নির্বাচন। জেলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই পৌরসভাটির মূল ফোকাস থাকে পুরো জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে। ইতোপূর্বে যারাই হয়েছেন এ পৌরসভার মেয়র- প্রত্যেকেই কমবেশি জেলার রাজনীতিতে রেখেছেন তাদের স্ব-স্ব অবস্থানের স্বাক্ষর।
কিন্তু আগামি ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে মেয়রসহ মোট ২১ পদে ৬৭ জন প্রার্থী অংশ নিলেও ৬৪ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর অধিকাংশেরই তেমন কোন প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ২/৪টি ওয়ার্ডে কিছুটা জোরালো প্রচারণা বা গণসংযোগ হলে বাদবাকিদের যেই সেই অবস্থা। এমনকি গণমাধ্যমগুলোতেও তাদের প্রচারণার কোন সংবাদও পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যতিক্রম প্রধান দুই দলের মেয়র প্রার্থী। এর মধ্যে অনেকদূর এগিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী অ্যাড. জিল্লুর রহমান জুয়েল। তিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।
গত এক শতাব্দীতে পৌরবাসীর জন্য উন্নয়ন কম-বেশি যা’ই হোক না কেন, চাঁদপুর পৌর নির্বাচন মানেই ছিলো উত্তাপ আর উত্তেজনার রাজনীতি। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো চাঁদপুর পৌরসভা নির্বাচনে নেই উত্তাপ কিংবা তেমন উত্তেজনা। সাধারণ মানুষ বলছে, বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালীন সময় হওয়ায় নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীরা বিশেষ করে কাউন্সিলর প্রার্থীদের অবস্থানে থাকায় উত্তাপ ছড়াতে পারছে না এবারের পৌর নির্বাচনের পরিবেশ। এছাড়া বার-বার হাইকোর্টে গিয়ে রিট করে নির্বাচন থামানোর অপকৌশলও এজন্য অনেকটা দায়ী। তবে ভোটাররা নির্বাচন নিয়ে একেবারেই নিস্তেজ। ভোটারদের ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে প্রার্থী ও প্রশাসনের আরো উদ্যোগী হওয়া দরকার বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে ৩ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থী নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে প্রচার-প্রচারণাসহ গণসংযোগ ও উঠান বৈঠক অব্যাহত রাখছেন সমানতালেই। যার কারণে কিছুটা হলেও শেষ মুহূর্তে লক্ষ্য করা যাচ্ছে পৌর এলাকায় নির্বাচনী পরিবেশ কিছুটা হলেও আছে। তবে কাউন্সিলর প্রার্থীরা তাদের কর্মকাণ্ড সীমিত করায় পুরোপুরি নির্বাচনী পরিবেশ এখনো ফিরছে না ভোটের মাঠে। চাঁদপুর পৌর নির্বাচনের ১৫টি ওয়ার্ডেই একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তারা গণসংযোগে তেমন নামছেন না। আবার অনেকেই ভোটারদের কাছে গেলেও মনে হচ্ছে তারা অতি সংগোপনে যাচ্ছেন। এতে করে নির্বাচনী পরিবেশে অনেকটাই সীমিত মনে করছে পৌর নাগরিকরা।
অপরদিকে আগের যে কোন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থীরা স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে তাদের সংবাদ ও বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা করলেও চলতি নির্বাচনে তাদের তেমন কোন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তারা নীরবে-নিভৃতে কাজ করছেন। তবে সে ধরনের কোন অবস্থাও দেখা যাচ্ছে না। তারা মনে করছেন, পত্রিকাগুলোতে তাদের সংবাদ ও বিজ্ঞাপন প্রচার না করলেও চলবে। তাদের অনেকেরই আগ্রহ বিকল্প উপায়ে জয়ী হওয়া।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণেই মূলত প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় বেশি আগ্রহ দেখাতে পারছে না। কাউন্সিলরসহ সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা শেষ মুহূর্তে হয়তো আরো সক্রিয় হবে, এমন আশা পৌর এলাকার সর্বসাধারণের। হয়তো শেষ মুহূর্তেই প্রার্থীরা তাদের ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, পোস্টার আর লিফলেটে ঢেকে দিবে পুরো পৌর এলাকা। সাথে বাড়বে তাদের নিজ নিজ কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে গণসংযোগ কিংবা উঠান বৈঠকের সংখ্যাও। তাহলেই হয়তো ফিরবে অনেকটা নির্বাচনী আমেজ।
বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, নিরুত্তাপ পরিবেশের আরেক কারণ হচ্ছে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতি। এবারের পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ইভিএম-এ। মূলত এ কারণেই অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী ভোটগ্রহণ শেষে চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে অনেকটাই শঙ্কায় আছে বলে জানা গেছে। তারা অনেকেই বৈশ্বিক করোনাকালীন সময়কে যেমন দায়ী করছেন তেমনি আশঙ্কা করছেন ভোটের দিন ভোটারদের উপস্থিতি কম হওয়ার। অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীই বলছেন নির্ধারিত পরিমাণ ভোটার উপস্থিতি না থাকলে কিংবা ৫ শতাংশের কম হলে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের অংশগ্রহণ দেখাবে তাদের নির্ধারিত নিয়মেই। কমিশন ঐ ভোট এক কোন প্রার্থীর দিকে প্রদান করলেই মূলতঃ ভোটের চিত্র কিংবা ফলাফলই পাল্টে যাবে। যার কারণেই নির্বাচনে অংশ নিয়েও তারা পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না।
অধিকাংশ প্রার্থীদের দাবি, ব্যানার, পোস্টার, বিলবোর্ড কিংবা গণসংযোগ যেটাই করা হোক না কেন সব কিছুর সাথেই জড়িত আর্থিক বিষয়। নির্বাচনে জয়-পরাজয় যেটাই হোক না কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হলে ভোটের মাঠে আর্থিক ব্যয় বাড়িয়ে লাভ নেই- বলে অভিমত অনেক প্রার্থীর। মূলত অধিকাংশ প্রার্থীই ভোটগ্রহণের পদ্ধতিকেই মূলত দায়ী করছেন। যার কারণে বর্তমানে অনেকটাই নিরুত্তাপ নির্বাচনী কিংবা ভোটের মাঠের পরিবেশ।
এদিকে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে ভোটের মাঠে মেয়র প্রার্থীদের দৌঁড়-ঝাপ অনেকটাই লক্ষ্য করার মতো। তারপরও সামগ্রিক পরিস্থিতি ভোটার কিংবা পৌরবাসীর মনে দাগ কাটতে না পারায় অনেকেই নিরুত্তাপ নির্বাচন বলছেন এবারের নির্বাচনকে। মূল শহরের রাজপথসহ আবাসিক এলাকাগুলো অলিতে-গলিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মেয়র প্রার্থীদের বিলবোর্ড অনেকটাই নজর কারছে পৌরবাসীর দৃষ্টিতে। যা কিছুটা হলেও নির্বাচনী পরিবেশকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে সর্বসাধারণের মনে।
তবে পৌরবাসী বলছে, আগামি ১০ অক্টোবর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা নির্বাচনী পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে নির্বাচন কমিশন। ভোটারদের এমন পূর্বাভাষ কতটা দিতে পারবে নির্বাচন কমিশন সেটাই নিয়েই ভাবছে নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থীরা। ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ হলেই কেবল প্রার্থীদের মাঝেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ ফিরবে। এখন দেখার অপেক্ষা নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি চাঁদপুরের প্রশাসন কতোটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারে পৌরবাসীকে।
৪ অক্টোবর, ২০২০।