এ.আর পাইলট সরকারি উবির সামান্য ঘটনা ও ভুল তথ্যে
ফরিদগঞ্জ ব্যুরো
ফরিদগঞ্জে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছে একটি চক্র। সম্প্রতি উপজেলার এ.আর পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে গরুর মাংস খাওয়ানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা, ঘটনা আর ঘটনার পেছনের ঘটনা এসব নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নষ্টের অপচেষ্টা চালাচ্ছে চক্রটি। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন হিন্দু- বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা।
অভিযোগটিতে ভুল তথ্য বা অপব্যাখ্যা দিয়ে, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন ঐ চক্রটি এমন অভিযোগ করেন সুশীল সমাজের লোকজন।
অভিযোগে দেখা যায়, গত ১১ নভেম্বর ফরিদগঞ্জ এ.আর পাইলট সরকারি স্কুলে এসএসসি পরিক্ষার্থীদের বিদায় মিলাদ অনুষ্ঠানের শেষে কিছু হিন্দু ছেলে-মেয়েদের নাকি গরুর মাংশের বিরিয়ানী খাওয়ানো হয়েছে। সেখানে কিছু হিন্দু ছেলে-মেয়ে ক্ষুধার তাড়নায় না বুজে খেয়ে ফেলে। কয়েকজন প্যাকেট ফিরিয়ে দেয়। পরদিন ১২ নভেম্বর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের কাছে গেলে তিনি নাকি বলেন, আজ-কাল অনেক হিন্দুরা গরুর মাংস খায়। তোমরা খেয়েছো, তাতে কি হয়েছে। বিষয়টি হিন্দু সমাজে ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাতের সামিল বলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা অভিযোগ করেন।
ঘটনার সূত্র ধরে জানা যায়, গত ৬ নভেম্বর বিজ্ঞান বিভাগের এসএসসি পরিক্ষার্থীরা নিজের অর্থায়নে রেক-ডে নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম কাজল রেক-ডে পালন করতে নিষেধ করার পরেও শিক্ষার্থীরা গোপনে স্কুলে পিছনে গিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন। অনুষ্ঠানে খাবারের জন্য বাজারের হাজি হোটেল থেকে গরুর এবং মুরগীর বিরায়ানি ক্রয় করেন নিজদের চাঁদার টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীরা। পরে খাবারগুলো নিজদের মধ্যে ভাগ-বন্টন করে নেন শিক্ষার্থীরা। বন্টনকৃত বিরিয়ানীর প্যাকেট হিন্দু শিক্ষার্থী পূজা রানী নিজেই সংগ্রহ করে, খেতে গেলে দেখে প্যাকেটি গরুর মাংসের বিরিয়ানী। পরে সেটি সে না খেয়ে অপর এক মুসলিম শিক্ষার্থীকে দিয়ে দেয়। অপরদিকে ঘটনার দিন ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে ৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম ছিলেন বলে শিক্ষকরা জানান।
বিদ্যালয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিবাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ফরিদগঞ্জ এ.আর পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরিক্ষার্থীদের বিদায় ও মিলাদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্কুল কর্তৃপক্ষ ৭ নভেম্বর সকালে।
বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌরসভার মেয়র মুক্তিযোদ্ধা আবুল খায়ের পাটওয়ারী এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান জি এস তছলিমসহ বিভিন্ন অতিথিবৃন্দ।
মিলাদ শেষে শিক্ষার্থীদের মাঝে মিষ্টান্ন বিতরণ করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। ওইদিন বিদ্যালয়ের পক্ষ কোনপ্রকার বিরিয়ানী আয়োজন করা হয়নি বলে জানান বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দ।
বিদায়ী শিক্ষার্থী পূজা রানী ও অথৈই বলেন, মিলাদে আমাদের বিরিয়ানী না মিষ্টি দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রধান শিক্ষককে না জানিয়ে, গোপনে আগের দিন ৬ নভেম্বর নিজেরা চাঁদা দিয়ে রেক-ডে আয়োজন করি। পরে আমরা সকব শিক্ষার্থী মিলে হোটেল থেকে বিরিয়ানী ক্রয় করে খাওয়ার আয়োজন করি। সেই থেকে ভুলবশত আমার ভাগে একটি গরু মাংসের বিরিয়ানী প্যাকেট হাতে নেই। আমি সেই প্যাকেট থেকে একটু মুখে দিয়ে দেখি এটি গরুর মাংসের আমি দ্রুত ফেলে দেই।
এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ এ.আর পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক রফিকুল আমিন কাজল বলেন, মিলাদ অনুষ্ঠান হয় ৭ নভেম্বর। অনুষ্ঠানের পরে ৯ কিংবা ১০ নভেম্বর একজন শিক্ষার্থী জানান, স্যার আমরা রেক-ডে অনুষ্ঠান করেছি, সেখানের খাওয়ার আয়োজনে বিরিয়ানী ছিল। আমি ভুলে গরুর মাংসের বিরিয়ানীর প্যাকেট পেয়েছি। খেতে গিয়ে জানতে পারি এটি গরুর। তাই আমি আর খাইনি। তখন আমি বলি, তোমাদের না রেক-ডে অনুষ্ঠান নিষেধ ছিল। পরে তাকে আমি বলি, তুমি কি গরুর মাংস খেয়েছো?- এমন প্রশ্নের জবাবে সে বলে, না স্যার একটু ভুলবশত মুখে দিয়ে দেখেছি। তখন আমি শান্তনা দেওয়ার জন্য বলি, ভুলবশত একটু মুখে নিয়েছো, এরকম ভুল অনেকে করে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সতর্ক থাকবে। পরে সে চলে যায়। কিন্তু সামান্য এই বিষয়টি নিয়ে একটি চক্র ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই চক্রটি ফরিদগঞ্জ উপজেলার ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি নষ্টের জন্য ওঠে পড়ে লেগেছে।
এদিকে জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া অভিযোগ আমলে নিয়ে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি হরিকে তদন্ত করার নির্দেশ প্রদান করেন জেলা প্রশাসক। গত ২৩ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি হরি উভয় পক্ষের সাথে দিনের ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।
তদন্ত চলাকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি হরি উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ডা. পরেশ চন্দ্র পালকে আর কোন অভিযোগ আছে কিনা এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি থার্ড-পার্সনদের সামনে কথা বলবো না। তার এমন মন্তব্যে সেখানে উপস্থিত থাকা পৌর মেয়র, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক ও সাংবাদিকরা বিব্রতবোধ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলি হরি বলেন, জেলা প্রশাসক আমাকে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি তদন্ত করে পাঠিয়ে দিয়েছি। বাকি সব কাজ জেলা প্রশাসক মহোদয়ের।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সচেতন মহলের প্রশ্ন কোন স্বার্থ হাসিলের জন্য ওই চক্রটি এই বিষয় নিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।
৩০ নভেম্বর, ২০২১।
