‘বুলবুল’ এর কারণে চাঁদপুরে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত

সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ

ইলশেপাড় রিপোর্ট
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ক্রমশ শক্তি বাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, শনিবার রাত ৮টায় পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ উপকূলে ঝড়টি আঘাত হানতে পারে। একই সময় বাংলাদেশেও আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ওড়িশার পারাদ্বীপ থেকে বাঁক নিয়ে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ক্রমশ পশ্চিমবঙ্গের দিকে এগোচ্ছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের অনুমান, শনিবার রাত ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে সাগরদ্বীপ ও খেপুপাড়ায় আঘাত হানতে পারে ভয়ঙ্কর এ ঘূর্ণিঝড়টি।
তারা আরও জানিয়েছেন, একই সময়ে বাংলাদেশের খেপুপাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল এ ঘূর্ণিঝড়টি আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের দিঘা থেকে ৭৫ ও কলকাতা থেকে বুলবুলের দূরত্ব এখন ১৬০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের খেপুপাড়া থেকেও বুলবুলের দূরত্বও কমে হয়েছে ২৪০ কিলোমিটার।
ভারতের ঘূর্ণিঝড় বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় বিশাল এলাকায় আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুল পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় আছড়ে পড়বে। ঝড়টির গতিপথ অনুযায়ী সুন্দরবন এবং তার আশপাশেই আছড়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।’
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সমতলের আরও কাছে চলে আসায় পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগও ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতর অবশ্য বলছে, গতিবেগ বেশি থাকলেও স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময় গতি কমবে বুলবুলের।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল এর প্রভাব দেখতে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মোলহেড পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান। -ইল্শেপাড়

তারা এও বলেছে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল যেভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে তাতে ধারণা করা হচ্ছে স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময়ও গতি কমলেও তা হবে ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। শেষ মুহূর্তে যদি শক্তি বৃদ্ধি পায় তাহলে তা ঘণ্টায় ১৩৫ কিলোমিটার গতিতেও তা আঘাত হানতে পারে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর প্রভাবে চাঁদপুর থেকে লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।
গত শুক্রবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুরের বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক। তিনি জানান, আগের সময় অনুযায়ী শুক্রবার রাত ১০টা পর্যন্ত সিডিউলে থাকা লঞ্চগুলো ঢাকার উদ্দেশে চাঁদপুর ঘাট ছেড়ে গেছে। রাত ১০টার পর থেকে চাঁদপুর লঞ্চঘাট থেকে আর কোনো লঞ্চ ছাড়বে না। এছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলায় বিআইডব্লিউটিএ চাঁদপুর কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
গতকাল শনিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চাঁদপুর লঞ্চঘাট থেকে কোন লঞ্চ ছাড়েনি। লঞ্চঘাটে ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম সচেতনতার জন্য মাইকিং করতে দেখা যায়। এছাড়া চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান দুপুরে বড় স্টেশন মোলহেড ও লঞ্চঘাট পরিদর্শন করেন।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে চাঁদপুরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সারাদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় রোদের দেখা মেলেনি। ঘূর্ণিঝড়ে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় শুক্রবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের বাসভবনে এক জরুরি সভা হয়েছে।
সভায় জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রত্যেকের প্রস্তুত থাকতে হবে। যেসব সরকারি কর্মকর্তা ছুটিতে আছেন, তাদের অবিলম্বে কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ৫৮টি মেডিকেল টিম, স্থানীয় স্কাউট, রেড ক্রিসেন্ট, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন। তিনি আরো বলেন, সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার এবং বলগেট, ড্রেজার, ছোট নৌযানগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে। বিভিন্ন চরাঞ্চলে মাইকিং করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জরুরি অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য ১৮৪ মেট্রিক টন চাল, নগদ এক লাখ ৭০ হাজার টাকা, ৭৩৬ ব্যান্ডেল টিন এবং প্রতি ব্যান্ডেলের জন্য ৩ হাজার টাকা করে মজুদ রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান আরো বলেন, চাঁদপুর জেলার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ মোকাবেলায় ১১৭টি মেডিকেল টিম বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। চরাঞ্চল ও জেলে পাড়ায় মাইকিং করে নিরাপদে অবস্থান নিতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল এর কারণে চাঁদপুর থেকে লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় লঞ্চগুলো পন্টুনে বাঁধা রয়েছে। -ইল্শেপাড়

জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র নাছির উদ্দিন আহমেদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) মো. মিজানুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান, সদর ইউএনও কানিজ ফাতেমা, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা কেবিএম জাকির হোসেন প্রমুখ।
ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর কারণে চাঁদপুর আবহাওয়া অফিস ও বিআইডাব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে জেলা, উপকূলবর্তী নদী ও অদূরবর্তী চরাঞ্চলকে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে জেলার নদীগুলো উত্তাল হয়ে উঠায় চাঁদপুর থেকে সব রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
চাঁদপুর লঞ্চ মালিক প্রতিনিধি আলী আজগর জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর কারণে শুক্রবার রাত ৯টার পর থেকে সব রুটের লঞ্চ চাঁদপুর থেকে ছেড়ে যায়নি। সময় বাড়ার সাথে সাথে নদীতে বাতাস ও গুঁড়ি-গুঁড়ি বৃষ্টি বাড়ছে। কোন প্রকার নির্দেশনা ছাড়া লঞ্চ চলাচল শুরু হবে না।
এদিকে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, শত শত যাত্রী লঞ্চ ছাড়ার অপক্ষোয় বসে রয়েছেন। পরিবার-পরিজনদের নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে চলে যেতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে করে এক প্রকার ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তাদের। অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকা সত্ত্বেও পৌঁছতে পারছেন নিজ গন্তব্যে।
চাঁদপুর নৌ থানার ওসি মো. আবু তাহের খান বলেন, সার্বিক নিরাপত্তায় নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা লঞ্চঘাটে রয়েছেন। সাধারণ মানুষদের সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে। মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার এবং বলগেটসহ ছোট নৌযানগুলোকে নদী তীরবর্তী এলাকায় নিয়ে আসা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রবল শক্তি নিয়ে চাঁদপুরসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী ঘূর্ণিঝড়টি শনিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানার কথা।