সরকারি প্রণোদনার দাবি
মনিরুল ইসলাম মনির
স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন ও বেকারত্ব হ্রাসে কিন্ডারগার্টেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ক্লাস ও পরীক্ষা পদ্ধতি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, অভিভাবকদের সাথে সমন্বয় ও যোগাযোগ ইত্যাদি কারণে কিন্ডারগার্টেনের উপর অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ভরসা ও আস্থা বেড়ে গেছে। বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির করাল থাবার শিকার হয়ে সারা দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গতবছরের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে মতলব উত্তর উপজেলার শতাধিক কিন্ডার গার্টেন। দীর্ঘ ১৩ মাস প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেতন-ভাতা না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছে এসব কিন্ডারগার্টেনের সাথে জড়িত প্রায় এগারশ’ শিক্ষক ও কর্মচারী। পেটের তাড়নায় অনেকেই সম্মানজনক এই পেশা পরিবর্তন করে নিম্ন আয়ের পেশা গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিন্ডারগার্টেনগুলো চলে মূলত শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন, সেসন ফি, পরীক্ষা ফি, কোচিং ফি ইত্যাদি দিয়ে। কিন্ডারগার্টেনগুলো সরকারি কোন প্রকার অনুদান পায় না। প্রাণঘাতী করোনার থাবায় দীর্ঘ ১৩ মাস ধরে তালাবদ্ধ এই প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান থেকে ৩ হাজার থেকে সর্বোচ ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসিক বেতন পেয়ে থাকে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বাজারে এই বেতন কিছুই না। প্রাইভেট আর কোচিংয়ের উপর ভর করে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকলে প্রাইভেট পাওয়ার সুবিধা হওয়ায় বেতনের তোয়াক্কা না করে এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীরা এসব কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতার পেশা বেছে নেয়। এই চাকরি গ্রহণের জন্য অনেককেই প্রতিষ্ঠানে দিতে হয়েছে অনুদান। করোনা ভাইরাসের কারণে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে প্রাইভেট ও কোচিং। বেতন-ভাতা না পাওয়া ও প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ থাকার কারণে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত শিক্ষকরা চরম আর্থিক সংকটে দিনাতিপাত করছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার-দেনা করে, দোকানে বাঁকী খেয়ে তাঁরা কোন রকমে জীবন ধারণ করছে। কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা পেশাগত কারণে না পারছে কারো কাছে হাত পাততে আবার না পারছে সুন্দরভাবে জীবন চালাতে। অন্যদিকে সরকারিভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও প্রণোদনার ক্ষেত্রে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক ও কর্মচারীদের বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। বাধ্য হয়েই জীবন আর জীবিকার তাগিদে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকরা তাদের সম্মানিত পেশা পরিবর্তন করে অপেক্ষাকৃত কম সম্মানের পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
এ বিষয়ে মতলব রেঁনেসা কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম আজাদ জানান, পেটের দায়ে ইতোমধ্যেই শিক্ষকদের কেউ দারোয়ানের চাকরি, কেউ দোকানের কর্মচারী আবার কেউ দিনমজুরীর পেশা বেছে নিয়েছেন। অনেক শিক্ষক একটি কাজের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষকে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হলেও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি আমলে নেওয়া হয়নি। দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ড্রপ আউট হওয়া শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে এনে কিন্ডারগার্টেনগুলো আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তা নিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করেন এই শিক্ষক নেতা। কিন্ডারগার্টেনের সমস্যা পীড়িত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জীবনযাপনে সহায়তার জন্য তাদের প্রণোদনা দেওয়ারও জোর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী শরিফুল হাসানের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক ও কর্মচারীদের আর্থিক সংকটের বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোন সহায়তা না পাওয়ায় তাদের বিষয়ে কিছু করা সম্ভব হয়নি। জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে স্থানীয়ভাবে তাদের জন্য কিছু করা যায় কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২৪ মে, ২০২১।
