‘শিল্প-শিক্ষাখাতের সমন্বয়; নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত’ শীর্ষক ওয়েবিনার

বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য টেকসই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় শিল্প-শিক্ষাখাতের সমন্বয় জরুরি
……….শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘শিল্প-শিক্ষাখাতের সমন্বয়; নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত’ শীর্ষক ওয়েবিনার শনিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি প্রধান অতিথি এবং বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ বিশেষ অতিথি হিসেবে এ ওয়েবিনারে যোগদান করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, এমপি বলেন, বৈশি^ক প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য শিক্ষা ও শিল্পখাতের বিদ্যমান মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে এবং একই সাথে নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজেদেরকে দক্ষ করে তুলতে হবে। তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য টেকসই গবেষণা কার্যক্রমে শিল্পখাতকে সহযেগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং এ ধরনের কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগ একান্ত অপরিহার্য, যার মাধ্যমে বিশ^বিদ্যালয়সমূহ শিল্পখাতের প্রয়োজনীয় মাফিক শিক্ষা কারিক্যুালম প্রস্তুতের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সক্ষম হবে। তিনি দু’খাতের বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে আনার উপর জোরারোপ করেন এবং শিল্পখাতের দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে একটি ম্যাপিং করা খুবই জরুরি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এবং এ সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের ‘শিক্ষা, শিল্প এবং গবেষণা’ ত্রিপাক্ষিক সমন্বয় বাড়ানো একান্ত অপরিহার্য। তিনি দেশের কারিগরি ও প্রযুক্তি ভিক্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবতনের উপর জোরারোপ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে তথ্য-প্রযুক্তি খাতের অভাবনীয় উন্নতি ও এসডিজি ভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পরিবর্তন বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি সর্বোপরি সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি জানান, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে প্রায় ৬৩.৫ মিলিয়ন লোক নিয়োজিত রয়েছে এবং প্রতিবছর প্রায় ২০ লক্ষ নতুন জনবল শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভের পরও শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে চাকরি পেতে বেশ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের বিশ^বিদ্যালয়সমূহ হতে শিক্ষাজীবন শেষ করার পর প্রায় ৩৮.৬% শিক্ষিত তরুণ কর্মহীন হয়ে পড়ে, যা কিনা শিল্পখাতের প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবকেই প্রমাণ করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিযোগী সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে শিল্প ও শিক্ষাখাতের সমন্বয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে আভির্ভূত হয়েছে।
রিজওয়ান রাহমান বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে বতমানে কর্মক্ষম জনশক্তির প্রায় ৫০ ভাগকেই পুনঃদক্ষ করে তোলতে হবে এবং দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বিশ^বিদ্যালয়গুলো এবং বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করার উপর জোরারোপ করেন, ডিসিসিআই সভাপতি। এছাড়া তিনি বিশ^বিদ্যালয়সমূহে কার্যকর গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি সময়োপযোগী শিক্ষা ক্যারিকুলাম প্রণয়ন ও প্রবর্তনের আহ্বান জানান। ডিসিসিআই সভাপতি আরো বলেন, বিশ^বিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমে কর অব্যাহতি প্রদান করা যেতে পারে এবং একই সাথে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ আরো প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন।
বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, আমাদের শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যকার ব্যবধান অত্যন্ত বেশি, যা নিরসন এখন সময়ের দাবি। তিনি শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমে আরো বেশি হারে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার জন্য বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানান। ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, শিল্পখাতের প্রয়োজনের নিরিখে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হলে, বিদেশ হতে কর্মী নিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় মেধাবীদের কাজের সুযোগ বাড়বে। তিনি বিশ^বিদ্যালয়সমূহকে বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিকে ক্যারিকুল্যাম প্রণয়নের আহ্বান জানান।
ওয়েবিনারের মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, বিশ^বিদ্যালয়সমূহ শুধুমাত্র প্রতিবছর গ্রাজুয়েট তৈরি করার উপর গুরুত্ব না দিয়ে বরং তারা শিক্ষাজীবনে কতটুকু দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে তার উপর বেশি প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। সবুর খান মনে করেন, শিল্পখাতকে বিশ^বিদ্যালয়ের সাথে সুদৃঢ় সমন্বয় বজায়ে রাখা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে শিল্পখাতের প্রয়োজনের নিরিখে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতে সক্ষম হবে। তিনি জানান, ব্লুমবার্গ প্রকাশিত ‘ইনোভেশন ইনডেস্ক ২০২১’ অনুযায়ী, উদ্ভাবনের দিক থেকে দক্ষিণ কোরিয়া সারা পৃথিবীতে নেতৃত্ব দিচ্ছে, আর এটি সম্ভব হয়েছে সেদেশে শিল্প ও শিক্ষাখাতের কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাজারে বাংলাদেশের টিকে থাকার জন্য তিনি শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে আরো বেশি হারে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। সরকারি ও বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যকার সর্বোত্তম চর্চা ও সাফল্যগুলো নিজেদের মধ্যে বিনিময় করা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন সবুর খান।
নির্ধারিত আলোচনায় এ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বুয়েট-এর ‘রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার ফর সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর পরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান তালুকদার, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক তাহমিনা বিনতে মোস্তফা এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ‘ইন্সটিটিউট অব বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর অধ্যাপক ও পরিচালক ড. সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার অংশগ্রহণ করেন।
ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এন কে এ মবিন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মনোয়ার হোসেন এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ ওয়েবিনারে যোগদান করেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১।