মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
আগের সব রেকর্ড ভেঙে এবার সর্বোচ্চ দরে আলু কিনতে হয়েছে ভোক্তাদের। গত ১৫ দিন আগে থেকে বাজারে পর্যাপ্ত নতুন আলু পাওয়া
গেলেও দাম কমার কোন লক্ষণ নেই। এখনো আলুর দাম আকাশছোঁয়া। পুরানো আলু কেজি প্রতি ৫০ টাকা এবং নতুন আলু ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে এ বছর কৃষকরা লাভবান হয়েছেন বেশি। তাই রবি মৌসুমে বেশি লাভের আশায় হাজীগঞ্জে আলুর চাষে মাঠে নেমে পড়েছেন চাষিরা।
চলতি মৌসুমে মাঠ থেকে পানি নামার পরই আলুর জন্য জমি প্রস্তুত করতে মাঠে নেমেছেন চাষিরা। শীত উপেক্ষা করে সকাল-সন্ধ্যা মাঠে কাজ করছেন তারা। জমি তৈরি করা, হিমাগার থেকে বীজ উত্তোলন, আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ এবং প্রস্তুতকৃত জমিতে আলু রোপণের কাজে এখন তারা ব্যস্ত। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ আলু চাষের জমিতে বীজ রোপণ হয়ে গেছে। বাকি জমিগুলোকে চাষযোগ্য করা হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, হাজীগঞ্জের ১২টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে ও পৌরসভার কিছু এলাকায় কৃষকরা জমিতে আলু চাষ করেছেন। আবার প্রস্তুতকৃত জমিতে সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কারসহ আলুর বীজ রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলায় সাধারণত ডায়মন্ড আলুর চাষ বেশি হয়ে থাকে। উপজেলা কৃষি বিভাগও এ জাতের আলু চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।
চাষিদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, গত বছরসহ চলতি বছর দাম ভালো পাওয়ায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলু চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের। তাছাড়া আলুর ফলনও ভালো। শেষ পর্যন্ত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না দেখা দিলে এবারও আলুর বাম্পার ফলন হওয়ার আশা করছেন তারা। তবে এ বছর বীজের দাম বেশি থাকায় এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় গতবারের চেয়ে এবার আলু চাষের খরচও বেড়েছে বলে জানান চাষিরা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ১২ হাজার ৮৫ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৪শ’ হেক্টরে বোরো ধান ও প্রায় ৩ হাজার হেক্টরে রবি শস্যের আবাদ হয়ে থাকে। এই ৩ হাজার হেক্টর রবি শস্যের মধ্যে ৮শ’ হেক্টর জমিতে আলু চাষের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭২৫ হেক্টরে চাষ করা হয়েছে। যেহেতু এখনো সময় আছে, সেহেতু আলু চাষ আরো বাড়বে। যা লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারো সরকারি প্রণোদনার অংশ হিসেবে কৃষি পূনর্বাসন কর্মসূচি ২০২০-২১ এর আওতায় পৌরসভাসহ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৪৭০ জন কৃষকের মাঝে ডিএমপি ও এমওপিসহ মোট ১৬ হাজার ৬৫০ কেজি সার এবং বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সরষিা, পেঁয়াজ, মরিচ, টমেটো, মুগ, মসুর, খেসারি, সূর্যমুখী ও হাইব্রীড ধানসহ বিভিন্ন ধরনের মোট ৮ হাজার ৮৪৮ কেজি বীজ পৌঁছে দিয়েছে।
জানা গেছে, গত বছর উপজেলায় ৬শ’ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এ বছর (২০২০-২০২১) দাম ভালো পাওয়ায় চাষিরা এবার আলু চাষে অধিক মনোযোগী হয়ে উঠেছেন। ইতিমধ্যে উপজেলার ৭২৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়ে গেছে। এখনো অনেককে জমি তৈরিসহ সার প্রয়োগ ও আলু রোপণ করতে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ রোপণ করা আলু ক্ষেতের পরিচর্যা করছেন।
এদিকে চাষিদের আলু চাষের আগ্রহ দেখে প্রতিয়মান হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ২শ’ হেক্টরেরও বেশি জমিতে বেশি আলু চাষ হবে। যা উপজেলার কৃষি অফিসের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যে আশায় কৃষকরা আলু চাষে ঝুঁকছে তা পূরণ নাও হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। কারণ, যে হারে আলুর বীজ রোপণ হচ্ছে তা চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন হতে পারে।
এ বছর কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ দামে আলু বিক্রি হয়েছে বলে জানান মাসুদ হোসেন নামের হাজীগঞ্জ বাজারের একজন আলু ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে পুরাতন আলুর জোগান নেই। ঢাকা থেকে এনে পুরান আলু বিক্রি করছেন তিনি। যা পাইকারি দরে কেজি প্রতি ৪৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর নতুন আলু কেজি প্রতি ২৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন বলে তিনি জানান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মাজেদুর রহমান জানান, বেশি ফলনে আলু চাষিদের উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বিভিন্ন পরামর্শ এবং উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ব্লক সুপারভাইজারদের সার্বক্ষণিক মাঠে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছে। আশা করি আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আশানুরূপ ফলন হবে এবং কৃষকদের মুখে হাসি ফুটবে। তিনি যে কোন বিষয়ে কৃষি অফিসের পরামর্শ নেয়ার জন্য চাষিদের প্রতি অনুরোধ জানান।
৭ জানুয়ারি, ২০২১।
