আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলন
মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
চলতি মৌসুমে টানা দুইবারের অনাকাক্সিক্ষত বৃষ্টির কারণে সারাদেশের মতো হাজীগঞ্জেও আলু, সরিষা ও শীতকালীন সবজিসহ ধানের বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে করে সরিষা, রসুন ও পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকলেও আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় ধস নেমেছে। বিশেষ করে চলতি মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতে আলু ও সরিষার বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া শীতকালীন সবজি বিক্রির আয় থেকে বঞ্চিত কৃষক।
জানা গেছে, গত ডিসেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে হাজীগঞ্জে টানা ৩ দিনের বৃষ্টিতে আলু, সরিষা, পেঁয়াজ, রসুন ও শীতকালীন সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপর কৃষক নতুন করে আবারো আলু, সরিষা, পেঁয়াজ ও রসুনের বীজ বপন করে। কিন্তু গত সপ্তাহের টানা দেড় দিনের বৃষ্টির ফলে নতুন করে শংকা দেখা গেয়। এতে আলু, রসুন ও পেঁয়াজের বীজতলার ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে।
এদিকে গত সপ্তাহের বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতির আশংকা করা হলেও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলরুবা খানম নিশ্চিত করেছেন, ক্ষতির কোন সম্ভাবনা নেই। নতুন করে কোন দুর্যোগের সম্মুখীন না হলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের আশা করেন তিনি। তবে চলতি বছরে আলু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমেছে প্রায় ২শ’ হেক্টর।
লাভজনক ও নদীবিধৌত এলাকা মাটি হওয়ায় উপজেলায় আলু চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার মধ্যে কালচোঁ দক্ষিণ, কালচোঁ উত্তর, রাজারগাঁও, দ্বাদশগ্রাম ও বাকিলা ইউনিয়নে সবচে বেশি আলু চাষ হয়ে থাকে। তবে পৌরসভাসহ অন্যান্য ইউনিয়নেও কম-বেশি চাষাবাদ করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, মাঠে এখন সবুজের সমারোহ। কৃষকরা জমি পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ২০২১-২২ অর্থবছরে হাজীগঞ্জে ৬০৫ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়ছে ১৮ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন। যা গত বছর ছিল (২০২০-২০২১ অথ-বছর) ৭৮০ হেক্টর। অর্থ্যাৎ এ বছর আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ১৭৫ হেক্টর।
এছাড়া চলতি বছর ৪৮০ হেক্টর জমিতে ২৭২ মেট্রিক টন সরিষা, ৩৭ হেক্টর জমিতে ২২২ মেট্রিক টন রসুন ও ৬৫ হেক্টর জমিতে ৫২০ হেক্টর পেঁয়াজ চাষাবাদ হয়েছে।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে টানা তিন দিনের বৃষ্টির পানি দীর্ঘদিন মাঠে ছিল। যার ফলে মাঠ শুকাতে দেরী হওয়ায় নতুন করে বীজতলা তৈরি করেননি অনেক কৃষক। আবার সময়মতো চাষাবাদ করতে না পারায় অনেক আলু চাষি অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন। তাই চলতি বছর আলুর চাষাবাদে ধস নেমেছে।
কথা হয়, কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নের কালচোঁ গ্রামের কৃষক আবুল খায়ের জানান, তিনি আড়াইকানি (৩শ’ শতাংশ) জমিতে আলু চাষ করেছেন। গাছের অবস্থান দেখে বুঝা যাচ্ছে, ফলন ভালো হবে। তিনি বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ২শ’ থেকে আড়াইশ’ মন আলু উৎপাদন হবে, ইনশাআল্লাহ।
কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামের কৃষক আলী আক্কাস জানান, গত বছরও আলুর ফলনও ভালো হয়েছিল। তাই এবার নিজের ২ কানি (২৪০ শতাংশ) জমি আরো বর্গা নিয়েছি ৩ কানি। মোট ৫ কানি (৬ শতাংশ) জমিতে আলু চাষ করেছি। প্রথমদিকে সারের সমস্যা ছিল। পরে কৃষি অফিসের সহযোগিতায় সার পেয়েছি।
তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে কিছুটা সমস্যা থাকলেও জমিনের কোথাও পানি জমেনি। আগামি ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে আলু উত্তোলন করতে পারবো। সব মিলিয়ে প্রায় ৪শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ মন আলু পাওয়া যাবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলরুবা খানম বলেন, গত সপ্তাহে যে বৃষ্টি হয়েছে তাতে ফসলের কোন ক্ষতি হয়নি। আমি মাঠ পর্যায়ে ঘুরে দেখেছি, কোথাও বৃষ্টির পানি জমেনি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আলু, সরিষা, রসুন ও পেঁয়াজের বাম্পার ফলনের আশা করছি। এসময় তিনি জানান, চলতি বছর ২৫০ জন সরিষা চাষি এবং ২০ জন রসুন ও পেঁয়াজ চাষিকে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে বলে।
উল্লেখ্য, ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে আলু, সরিষা, পেঁয়াজ, রসুন ও শীতকালীন সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ওই সময় প্রায় ২৮০ হেক্টর আলুর বীজ, ৪০৫ হেক্টর সরিষা বীজ, ৬১০ হেক্টর শীতকালীন সবজি ও ১৫ হেক্টর রসুনের বীজ নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া ৪০ হেক্টর জমির বপনকৃত পেঁয়াজের অর্ধেকেরও বেশি নষ্ট এবং ৫০৫ হেক্টর জমির বোরধানের বীজতলার প্রায় ১০ শতাংশ নষ্ট হয়েছিল।
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২।
