হাজীগঞ্জে ধর্ষক ও ইউপি সদস্যসহ ৫ জন জেলহাজতে

ধর্ষক কিশোর নয়, প্রাপ্তবয়স্ক

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্
হাজীগঞ্জে ধর্ষণের শিকার অষ্টম শ্রেণি পড়–য়া কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় আটক আসামি মো. রায়হান কিশোর নয়, প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ। জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী তার বয়স ১৮ এর বেশি বলে নিশ্চিত করেছেন হাজীগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নজরুল ইসলাম। মঙ্গলবার (১৬ মে) তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। গত সোমবার বিকালে তাকে আটক করে পুলিশ।
ধর্ষক রায়হান উপজেলার হাটিলা পূর্ব ইউনিয়নের লাওকরা গ্রামের সর্দার বাড়ির সিরাজুল ইসলাম ছেরু সর্দারের ছেলে। এর আগে মামলার অপর ৪ আসামিকে সোমবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। তারা হলেন- রায়হানের বোন মোসা. হাজেরা বেগম (২৫) ও খালেদা আক্তার (২২), চাচাতো ভাই ও একই বাড়ির হাসান সর্দারের ছেলে মো. হাবিবুর রহমান সর্দার (৩০) ও ইউপি সদস্য মো. রহমত উল্যাহ্ (৪৩)।
এ ঘটনায় কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে হাজীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে উল্লেখিতদের আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই কিশোরী একই বাড়ির ও স্থানীয় একটি মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা সম্পর্কে চাচা-ভাতিজি। এ ঘটনায় ইউপি সদস্যেরে নেতৃত্বে সালিসি বৈঠকের মাধ্যমে গত শুক্রবার বিকালে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
জানা গেছে, গত ২১ মার্চ বিকালে মাছের খাদ্য মাথায় তুলে দেওয়ার কৌশলে কিশোরীকে ঘরের ভিতরে ডেকে নিয়ে যায় মো. রায়হান। এরপর তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এছাড়া প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করলে ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। বিষয়টি জানাজানি হলে গত শুক্রবার (১২ মে) বিকালে ইউপি সদস্য রহমত উল্যাহ্র নেতৃত্বে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও দুই পরিবারের লোকজনকে নিয়ে সালিসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ওই বৈঠকে ধর্ষক ও ধর্ষণের শিকার কিশোর-কিশোরীর অপ্রাপ্ত বয়স ও সম্পর্কে চাচা-ভাতিজির কথা উল্লেখ করে কিশোরীর পরিবারকে চাপ-সৃষ্টি করা হয় এবং কিশোরীর চিকিৎসার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় রফাদফা করে দুই পক্ষের স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওই সময় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাইয়্যুম বেপারী ও কুদ্দুস সর্দারসহ চারজন সালিসদার এবং দু’পক্ষের পরিবারের লোকজন উপস্থিত ছিলেন বলে কিশোরীর পরিবার জানান।
ধর্ষক মো. রায়হান স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে উল্লেখ করে হাজীগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নজরুল ইসলাম জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে রায়হানের বয়স ১৫ বছর দাবি করা হলেও জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী তার বয়স ১৮ বছরেরও বেশি। এসময় তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, অন্য সালিসদারদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ সংশোধিত ২০০৩ এর ৯ (১) এর ২০২/২১২/২১৩ ধারায় দায়েরকৃত মামলার সব আসামিদের আটক করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
এদিকে গত রোববার এ বিষয়ে ধর্ষণের শিকার কিশোরীর স্বজনরা সংবাদকর্মীদের জানান, মেম্বারসহ (ইউপি সদস্য) সবাই চেয়েছে বিষয়টির সমাধান হোক। তাই, তাদের কথায় আমরা রাজি হয়েছি এবং তাদের সিদ্বান্ত মেনে নিয়েছি।
আটকের আগে ইউপি সদস্য রহমত উল্যাহর সাথে সংবাদকর্মীদের কথা হলে তিনি জানান, উপর মহলের সঙ্গে কথা বলে এবং এলাকার শান্তির জন্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এ সালিসি বৈঠক করা হয়েছে। তবে উপর মহলের কে বা কার সঙ্গে কথা হয়েছে, তা জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কাইয়্যুম বেপারীর সাথে কথা হলে সালিসি বৈঠকের সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি জানান, গত শুক্রবার মেম্বার (ইউপি সদস্য) রহমত উল্যাহ তাকে নিয়ে ওই বাড়িতে যায়। এরপর মেম্বারের উপস্থিতিতে দুই পক্ষের চারজন সালিসদার ও দুই পরিবারের লোকজন বসে বিষয়টির সমাধান করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছেলে-মেয়ে উভয় অপ্রাপ্ত বয়স এবং তারা সম্পর্কে চাচা-ভাতিজি হয়। তাই, আমি তাদের থানা বা কোর্টে (আদালত) যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু মেম্বার, দুই পক্ষের লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা বিষয়টির সমাধান করে নেয়। পরে শুনেছি মেয়ের চিকিৎসার জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তখন আমি ছিলাম না।
অপর সালিসদার কুদ্দুস সর্দারের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা বলেন এবং পরে তিনি আমাদের প্রতিনিধির সাথে দেখা করবেন বলে জানান।
ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, এ বিষয়ে আমি জানি না। যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে ইউপি সদস্য রহমত উল্ল্যাহ এমন ঘটনার সমাধান না করে, ধর্ষিতার পরিবারকে আইনী সহায়তায় দিতে পারতেন।

১৭ মে, ২০২৩।