হাজীগঞ্জে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পুকুরের মাটি আ.লীগ নেতার বাড়িতে!

 

হাজীগঞ্জ ব্যুরো
হাজীগঞ্জের বড়কুল পশ্চিম ইউনিয়নে সরকারি ও বেসরকারিসহ দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভূমির পুকুর থেকে মাটি কেটে নিজ বাড়ির ভরাট অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউনিয়ন এক আওয়ামী লীগের নেতার বিরুদ্ধে। গত রোববার থেকে ওই ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রামচন্দ্রপুর কাসেমিয়া ছিদ্দিকিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার মালিকানাধীন পুকুর থেকে এই মাটি কাটার ঘটনা ঘটে।
তবে পারিবারিক সম্পত্তিতে মাটি কাটছেন এবং বিদ্যালয় ও মাদরাসার ভূমিদাতা পরিবার বলে সংবাদকর্মীদের কাছে দাবি করেন আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াছিন আরাফাত। তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে তিনি ইউনিয়ন উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী।
সরেজমিন পরিদর্শন করে জানা গেছে, বড়কুল পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দক্ষিণ পাশে এবং রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে অবস্থিত পুকুর থেকে ইয়াছিন আরাফাতের পারিবারিক ভূমি ভরাটের জন্য গত রোববার থেকে প্রতিদিন আটজন শ্রমিক মাটি কাটছেন বলে কর্মরত শ্রমিকেরা জানান।
এই পুকুরে রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ শতাংশ ও রামচন্দ্রপুর কাসেমিয়া ছিদ্দিকিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার ২৩ শতাংশ ভূমি রয়েছে। তবে পুকুরটি ৩২ শতাংশ বলে জানান, রামচন্দ্রপুর কাসেমিয়া ছিদ্দিকিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। বাকি ৬ শতাংশের মালিকানার বিষয়ে বর্তমানে কাউকে দাবি করতে দেখা যায়নি বলেও তারা জানান।
মাদরাসা সূত্রে আরো জানা গেছে, গত ৩/৪ বছর আগে পুকুরটি মৌখিকভাবে ইজারা নিয়েছেন স্থানীয় মফিজুল ইসলাম মফু। এরপর মুক্তিযোদ্ধা সুনীল চন্দ্র দাস এবং বর্তমানে ইয়াছিন আরাফাতের কাছে রয়েছে। তিনি ওই পুকুরে মাছ চাষ করেন। এর আয়ের টাকা স্থানীয় একটি মসজিদে ব্যয় করা হয় বলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জানান।
মুক্তিযোদ্ধা সুনীল চন্দ্র দাসের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, পুকুরটির ইজারাদার ইয়াছিন আরাফাত। আমি শুধু তত্ত্বাবধান করছি। গত কয়েকদিন আগে পুকুরের পাড় বাঁধবে বলে পুকুর থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য ইয়াছিন আরাফাত আমাকে জানান। এরপর আমি সেঁঁচ দিয়ে পুকুরের পানি নিষ্কাশন করি। কিন্তু পুকুরের পাড় বাধের পরিবর্তে তিনি যে নিজের পারিবারিক ভূমি ভরাট করছেন, তা আমি জানি না।
পুকুরটিতে মাদরাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমি রয়েছে স্বীকার করে ইয়াছিন আরাফাত বলেন, পুকুরে আমাদের পারিবারিক সম্পত্তিও রয়েছে। আমরা আমাদের পারিবারিক সম্পত্তির অংশ থেকে মাটি কাটছি। তাই কাউকে জানাইনি। মাদরাসা, বিদ্যালয়, মসজিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তারা পারিবারিকভাবে ভূমি দাতা বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরো বলেন, কিছু লোক রয়েছে। যারা সবসময় আমার পিছনে লেগে আছে। তারা কিছু দিন দিন পর সংবাদর্মীদের খবর দিয়ে ইউনিয়নে নিয়ে আসে। এ সময় তিনি তাদের (তথ্য দাতা) উদ্দেশ্যে চিৎকার করে গালমন্দ করতে থাকেন।
এ বিষয়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. শফিকুর রহমান বলেন, মাটি কাটার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এখন (বৃহস্পতিবার দুপুরে) আমি আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। এরপর বিষয়টি সরেজমিন দেখে তিনি মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে জানিয়েছেন। মাদরাসা সম্পত্তি কিভাবে রেজুলেশন ছাড়া মৌখিক ইজারা দেয়া হয়েছে, এ বিষয়ে তিনি সদূত্তর দিতে পারেননি।
মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, পুকুরে মাদরাসার ২৩ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ শতাংশ ভূমি রয়েছে। এখানে বাকি সম্পত্তি (ভূমি) অন্যদের থাকলেও ইয়াছিন আরাফাতদের পারিবারিক কোন ভূমি নেই বলে তিনি জানান।
মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুল আমিনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষনিক আমি অধ্যক্ষকে মাটি কাটার বিষয়ে বাঁধা এবং বিষয়টি স্থানীয় চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা গাজী মনির হোসেনকে জানানোর জন্য বলেছি।
রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খোরশেদ আনোয়ার বলেন, পুকুরে আমাদের তিন শতাংশ রয়েছে। আমাদের অংশ কাউকে ইজারা দেইনি এবং মাটি কাটার বিষয়ে কেউ আমাদের জানায়নি। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বকুল বলেন, পুকুরের যে অংশে মাটি কাটা হচ্ছে, ওই অংশ আমাদের না।
রান্ধুনীমুড়া ক্লাস্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহজাহান বলেন, বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলবো।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ চৌধুরী বলেন, সীমানা নির্ধারণের জন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. শফিকুর রহমানকে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি আমরা দেখবো।
১৮ জানুয়ারি, ২০২১।