হাজীগঞ্জ কৃষি বিভাগের সফলতা ভাসমান বেডে সবজি চাষ উপজেলার গন্ডি পেরিয়ে অন্য জেলায়

 

sdr

মোহাম্মদ হাবীব উল্যাহ্  :
ভাসমান বেডে শাক, সবজি ও মসলা চাষে হাজীগঞ্জের কৃষি অফিস ব্যাপক সফলতা লাভ করেছে। আর সফলতা দেখতে দেশের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা থেকে কৃষি কর্মকর্তাসহ কৃষকরা মাঠ পরিদর্শনে আসছেন। এখান থেকে তারা অভিজ্ঞতা অর্জন করে ভাসমান বেডে সবজি চাষ উদ্ধুদ্ধকরণ প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করছে। এই সাফল্য উপজেলা ও নিজ জেলার গন্ডি পেরিয়ে অন্য জেলায় পৌঁছে গেছে। ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী জেলা কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর জেলাসহ ১০টি জেলার ৪২ জন কৃষি কর্মকর্তা এই ভাসমান সবজি চাষ উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণে এসে মাঠ পরিদর্শন করে গেছেন।
উপজেলাধীন অনেক এলাকা রয়েছে বন্যা ও জলাবদ্ধপ্রবণ। বর্ষা মৌসুমে অধিকাংশ নিচু জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন কৃষকের কোন কাজ থাকে না। কৃষকদের এই বেকার সময়কে কাজে লাগাতে এবং তাদের আয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে গত কয়েক বছর যাবৎ উপজেলা কৃষি অফিস ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা উৎপাদন করার পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং দিচ্ছে। যা কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
কৃষক জলজ উদ্ভিদ কচুরিপানার মাধ্যমে এই ভাসমান বেড তৈরি করে শাক-সবজি ও মসলা চাষাবাদের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের সংস্থান করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের চাষাবাদের সাথে কৃষক নিজেদের খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন, অন্যদিকে নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
সাধারণত ভাসমান বেডের সবজিতে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। তাছাড়া বর্ষার ভরা মৌসুমে বাজারে শাক-সবজিরও অভাব থাকে। এই চাহিদা পূরণে বর্ষাকালে এলাকার নিচু জমিসহ ডোবা-নালায় জমে থাকা পানিতে ভাসমান বেডে সবজি চাষাবাদ করছে কৃষকরা। স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে ও সহায়তায় বেশ কয়েক বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্লাবন ভূমিতে এ পদ্ধতি সবজি চাষ হচ্ছে। ভাসমান বেডে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, গিমা কলমি, লালশাক, শসা, ডাটাশাক, মূলাশাকসহ ইত্যাদি শাক-সবজি ফসল আবাদ করা হচ্ছে।
ডাকাতিয়া নদীর অববাহিকার ভাটি অঞ্চল খ্যাত হাজীগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা বর্ষাকালে পানিতে তলিয়ে থাকায় এখানে অধিক হারে এ পদ্ধতিতে চাষাবাদের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় উপজেলা কৃষি বিভাগ। এছাড়া এ পদ্ধতিতে চাষাবাদে রাসায়নিক সার ব্যবহার হয় না বিধায় বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে এ পদ্ধতি খুবই ইতিবাচক বলে দাবি তাদের। বাজারে সুস্বাদু, নিরাপদ, রাসায়নিক ও বিষমুক্ত সবজির ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে। ফলে ভাসমান বেডে সবজি চাষ করে বর্ষা মৌসুমে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে চড়াদামে বিক্রি করে আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। এতে একজনের চাষাবাদে অন্যজন উৎসাহিত হয়ে দিনে দিনে ভাসমান বেড সবজি চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে উপজেলায়।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ প্রকল্পের আওতায় পৌরসভাসহ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ২০টি গ্রামে প্রায় ২ শতাধিক হেক্টর জমিতে ভাসমান বেডে শাক-সবজি ও মসলা চাষ করা হয়েছে। এই বেডের মাধ্যমে অন্তত ৬শ’ কৃষক চাষাবাদ করছে। ১৫/২০ ফুট দৈর্ঘের প্রায় সহ¯্রাধিক বেড তৈরি করে তারা মিষ্টি কুমড়া, লাউ, গিমা কলমি, লালশাক, শসা, ডাটা শাক, মূলা শাক ইত্যাদি ফসল আবাদ করছে।
পৌরসভাধীন বলাখাল গ্রামের কৃষক মো. আবু বকর সিদ্দিক জানান, আমি উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে গত কয়েকবছর যাবৎ ভাসমান বেডে সবজি চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি। কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কচুরিপানার তৈরি করা বেডে সবজি চাষ করছি। যার ফলে আগের (সনাতন পদ্ধতির) তুলনায় অনেক বেশি লাভবান হচ্ছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মনি সূত্রধর জানান, হাজীগঞ্জে ভাসমান বেডের চাষাবাদ দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা। অন্যান্য অঞ্চলগুলোর ভাসমান বেড সবসময় পানির উপর থাকে, কিন্তু আমাদের এখানে পানি ৬ মাস থাকে। সে ক্ষেত্রে চাষিরা শাক জাতীয় সবজি উৎপাদন করে থাকে। পানি শুকানোর দেড় থেকে দুই মাস আগে তারা লাউ ও মিষ্টি কুমড়া চারা রোপণ করে। ফলে পানি আস্তে আস্তে শুকিয়ে বেড জমিতে বসে যায়। ততদিনে চারা গাছ পরিপূর্ণতা লাভ করে পুরো মাঠ ছড়িয়ে গাছে ফলন আসতে শুরু করে। এটি বোরো ধান আসা পর্যন্ত চলতে থাকে। যার ফলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়।
তিনি আরো বলেন, প্রকল্প কৃষক ছাড়া অন্যান্য কৃষকদেরও উদ্ধুদ্ধ করে ব্যাপকহারে ভাসমান বেডে সবজি চাষ করার জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যার সফলতাও আমরা পাচ্ছি। এই প্রকল্প আমাদের উপজেলা, জেলা ছাড়িয়ে দেশের অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠ পরিদর্শন করেছেন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে দেশের ১০টি জেলা থেকে ৪২ জন কৃষি কর্মকর্তা উদ্ধুদ্ধকরণ ভ্রমণে এসে মাঠ পরিদর্শন করে যান।