আতংক থেকে মুক্তি চায় এলাকাবাসী
ফরিদগঞ্জ ব্যুরো
দেশের এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী নিহত পিচ্চি হান্নানের বাড়ি ফরিদগঞ্জ উপজেলার চরদুঃখিয়া পূর্ব ইউনিয়নে। তার জীবদ্দশায় ইউনিয়নে আতংক থাকলেও মৃত্যুর পর সেই আতংক কেটে যায় মানুষের মধ্যে। যদিও পিচ্চি হান্নান জীবিত থাকাকালীন সময়ে নিজ এলাকার মানুষের সাথে কোনরূপ রূঢ় আচরণ করতেন না, বরং নিজ এলাকার মানুষের জন্য সর্বদা দানশীল ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তবে তার সাঙ্গপাঙ্গদের কারণেই এলাকায় একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করতো। তার মৃত্যুর সাথে-সাথে তার সাঙ্গপাঙ্গরা ঐ ইউনিয়ন থেকে সটকে পড়ায় বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় সবকিছুই বদলে যায়। অনেকটা শান্তির সুবাতাস বইছিল এলাকায়। তবে বর্তমানে মাদক ও দেশীয় অস্ত্রের ঝলকানিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী।
গত কয়েক বছর ধরে আবারো অশান্তির ঝড় বইতে শুরু করে চরদুঃখিয়া পূর্ব ইউনিয়নে। দেশীয় অস্ত্রের ঝলকানি এবং গণধর্ষণের মতো কিছু ঘটনা ছাড়াও মাদকের রমরমা ব্যবসা গড়ে ওঠে এই ইউনিয়নে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে, মানুষ প্রকাশ্যে এলাকায় কিছু বলতে সাহস পায় না। তাদের মনে সর্বদা আতংক নামক বায়বীয় বস্তুটি ভর করেছে। সর্বশেষ দু’দল মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে একজনকে কুপিয়ে জখমের ঘটনা পরিস্থিতি আরো তীব্রতর করেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত কেউই এসব বিষয়ে কথা বলতে নারাজ।
সরেজমিন ঘুরে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধিসহ সবার সাথে কথা বলে জানা গেছে তাদের ভয়ের কারণ। সাধারণ মানুষ জানান, এই ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গ্রাম আলোনিয়া। বৃহৎ এই গ্রামটিকে মানুষ নিজেদের মতো করে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে বিভক্ত করে নিয়েছে। এরপরের বড় গ্রামটি সন্তোষপুর। এক সময় সন্তোষপুর এলাকা সন্ত্রাসপূর্ণ এলাকা বলে চিহ্নিত হলেও বর্তমানে সন্তোষপুরের তুলনায় আলোনিয়া এলাকাটিই বেশি ঝুঁিকপূর্ণ। রায়পুর উপজেলা সীমানাবর্তী এলাকায় হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই অপরাধ করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এক সময় এই এলাকায় প্রচুর ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কারণে হ্রাস পায় ডাকাতি। তবে ক্রমশঃ বেড়ে যায় মাদকের আস্তানা। এলাকাবাসীর মতে পুরো ইউনিয়নে চরমুরারী, শেখার দোকান এলাকা, পূর্ব আলোনিয়ার রায়পুর বর্ডার, খেয়াঘাট, গালকাটা বাজার, বেপারী বাজারসহ অনেক স্থান রয়েছে যেই এলাকাগুলো মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত। কথিত আছে- চরদুঃখিয়া পূর্ব ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় গাছে-গাছে থাকে মাদক। মাদক ব্যবসায়ীরা গাছের কুঠরে বা নির্দিষ্ট স্থানে মাদক রেখে যাওয়ার পর মাদকসেবীর চাহিদা অনুযায়ী তাকে ওই গাছটি চিহ্নিত করে দেয়। ইতোপূর্বে আইন-শৃংখলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকার সময়েও কৌশলে মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের কর্ম চালিয়ে গেছে- এমন অভিযোগ সাধারণ মানুষের। তাছাড়া যারাই মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধাচারণ করেছে কৌশলে তাদের হয়রানি করার চেষ্টা করেছে তারা।
স্থানীয়রা জানান, ইউনিয়নের বড় অংশ রায়পুর উপজেলার সীমানা হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই তাদের অপকর্ম করতে সাহস পাচ্ছে।
চাঁদপুরের সাবেক পুলিশ সুপার হারুনুর রশিদের সময় অব্যাহত ডাকাতিসহ অপরাধ ঠেকাতে রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের বর্ডার বাজারে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার দুই পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে ডাকাতদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু পরবর্তীতে ইয়াবা সহজলভ্য হওয়ায় কোনক্রমেই একে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। বরং ইয়াবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে এক-একটি গ্রুপ। এর সাথে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর অপরাধীরাও।
এই ইউনিয়নের গত কয়েক বছরের আলোচিত বেশ কয়েকটি ঘটনা রয়েছে। বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে যাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে প্রায় অর্ধশত লোক আহত হয়। এরমধ্যে বেশিরভাগ আহত হয় দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে। যাদের অধিকাংশ নেতাকর্মীকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা পঙ্গু হাসপাতালে। ওই ঘটনায় স্থগিত হওয়া ৩টি কেন্দ্রের উপ-নির্বাচনেও ভোট কেন্দ্রে জোরপূর্বক প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় ২০/২৫ নেতাকর্মী আহত হয়। উপ-নির্বাচনের আগের দিন রাতে চাঁদপুরের সাবেক পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারের নেতৃত্বে অস্ত্রসহ ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে আটক করেন। ওই মামলাটি চলমান রয়েছে। পরে জেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখেও বিশৃংখল কিছু ঘটনা ঘটে ওই এলাকায়। জাতীয় নির্বাচনেও দেশীয় অস্ত্রের মহড়াসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর আক্রমণ, মন্দির ও পূজামণ্ডপ ভাংচুর, দেশীয় অস্ত্রের মহড়াসহ অসংখ্য ঘটনা ঘটে এই ইউনিয়নে। এছাড়া বিএনপির কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাং প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা করে প্রতিপক্ষের উপর।
কিছুদিন আগে প্রতিবন্ধী এক যুবতীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠে। এ ব্যাপারে দায়েরকৃত মামলাটি এখন আদালতে। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ভাতিজা মহসিনের হাতে প্রকাশ্যে চাচা ফজলু মিয়ার খুন। লকডাউন চলাকালীন কালির বাজার কলেজের এক ছাত্রীকে সন্তোষপুর গ্রামের এক কথিত ও ভন্ড কবিরাজ কৌশলে অশ্লীল ছবি তুলে দিনের পর দিন ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছে ওই কবিরাজ। তুচ্ছ এক ঘটনায় ইউনিয়নের ইসলামগঞ্জ বাজারে অর্ধশত যুবক হাতে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কয়েকজনকে কুপিয়ে আহত করে। এ ঘটনা জনমনে আতংক সৃষ্টি হয়।
সর্বশেষ মাদক বিকিকিনি ও নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে গত ৭ জুলাই দিনেদুপুরে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে রাস্তার উপরে রেখে পাঁচ মাদকসেবী অপর এক মাদকসেবী হুমায়ুন খন্দকারকে
কুপিয়ে ফেলে রেখে যায়। বর্তমানে সে ঢাকা ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন রয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকেও হুমায়ুন তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ফলে হুমায়ুন সুস্থ হয়ে ফেরার পর আবারো পূর্ব আলোনিয়া এলাকায় বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।
পুলিশ সূত্র জানায়, ওই ঘটনায় আহত হুমায়ুন খন্দকারের বিরুদ্ধে মাদক নারী নির্যাতনসহ অন্তত ৭টি মামলা রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ রয়েছে। মামলাগুলো হচ্ছে- ৪২৫/২০১৯, জিআর ২২১/২০১৭, জিআর ১০৪/২০১৮, জিআর ২০৮/২০১৫, জিআর ২৭/২০১৬ ও জিআর ৪৫/২০১৬। এসব মামলা দায়েরের পর সে আরো ভয়ংকর হয়ে উঠে।
জানা গেছে, সারাদেশে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ার চলাকালে হুমায়ুন খন্দকারকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আল্টিমেটাম দেন ওই সময়ের থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা।
স্থানীয় লোকজন জানান, ওই কর্মকর্তা একটি মসজিদে মুসল্লিদের সাথে মাদকবিরোধী আলোচনা সভায় হুমায়ুন খন্দকারকে মাদক ও এলাকা না ছাড়লে ক্রসফায়ারে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে হুঁশিয়ার করে দেন। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারো সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে জানান স্থানীয় লোকজন।
সর্বশেষ ঘটনার ব্যাপারে স্থানীয় লোকজন জানান, হুমায়ুন খন্দকার, আলম ও জুয়েল গংদের সাথে নিকট অতীতে সুসম্পর্ক ছিল। এলাকাবাসী জানান, এক সময় এই দুই গ্রুপ মিলে এলাকায় মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় তাদের বিরুদ্ধে লোকজন ভয়ে কথা বলতে নারাজ। ফলে নির্দ্বিধায় তারা মাদকের রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে। এলাকার যুবক শ্রেণি এদের কালো থাবায় মাদকের দিকে ধুঁকছে। তারা এই ছোবল থেকে মুক্তি চান।
বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এই হুমায়ুন-জুয়েল গ্রুপের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি না হলেও বর্তমান আওয়ামী লীগের দলীয় এমপির প্রতিনিধি কাসেম ঢালী বলেন, হুমায়ুন খন্দকার এবং জুয়েল গ্রুপের যেই ঘটনা ঘটেছে তা পরে জেনেছি। এর নেপথ্যে রয়েছে মাদক ব্যবসা। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর না হলে এলাকা থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
স্থানীয় শেখার দোকান নামক স্থানের ফল ব্যবসায়ী আব্দুল মতিন খন্দকার জানান, দিনেদুপুরে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হুমায়ুন খন্দকারকে জুয়েলের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী কুপিয়ে ফেলে রেখে যায়। সে চিৎকার করলে আমরাসহ আশপাশের লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করি। তবে তিনি জানান, এরা সবাই একসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল।
আলোনিয়া খেয়াঘাট বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক পাটোয়ারী বলেন, আমরা এলাকার শান্তিকামী মানুষ হিসেবে এইসব বিশৃঙ্খলা থেকে নিস্তার চাই। প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের হস্তক্ষেপ না হলে অস্ত্র এবং মাদক থেকে এলাকাবাসী রক্ষা পাবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত একজন বলেন, এই ইউনিয়নে ব্যাপক দেশীয় অস্ত্র এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্যাপক মাদক বেচাকেনা হচ্ছে। হচ্ছে বাল্য বিবাহ। কিশোররা বই বাদ দিয়ে মুঠো ফোনে আসক্ত হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের নজরে পড়লে হয়ে যাচ্ছে মাদক সেবী।
সাবেক ইউপি সদস্য মফিজুর রহমান বলেন, মাদক ও অস্ত্রের ভয়ে মানুষ আতংকে রয়েছে। এলাকার দুই একজন ছাড়া কেউই মুখ খুলে না। ভয় একটাই প্রকাশ্যে তাদের কিছু না করলেও যদি তাদের সন্তানদের বিপথে নিয়ে যায়।
একই কথা বলে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ পাটওয়ারী, আমাদের ইউনিয়ন খুবই সুন্দর। কিন্তু মাদক ও অস্ত্রের মতো কিছু অসুন্দর বস্তু পুরো পরিবেশকে ধ্বংস করছে। আমাদের কিছু না করতে পারলে আমরা আতংকিত আমাদের সন্তানদের নিয়ে।
জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ভাতিজা মহসিনের হাতে প্রকাশ্যে চাচা ফজলু মিয়ার খুন হওয়ার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বাছির আহমেদ বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে আরো অনেক ঘটনা ঘটে চলছে। লকডাউনের কারণে আদালত বন্ধ থাকায় কোন মামলা দৃশ্যমান হচ্ছে না। শুধু কয়েক বাড়ির হিসেব দিয়ে বলেন আদালত খুললেই জমি, মাদকসহ নানা বিষয়ে, অন্তত ত্রিশটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি রয়েছে।
তিনি জানান, এলাকাতে এইসব মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলছে না। এরা উভয় পক্ষই মাদকসেবী। এরা এলাকায় মাদকের ব্যাপক বিস্তার গড়ে তুলেছে। পুর্বের ন্যায় চিরুণি অভিযান করলে এদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ দেশী/বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
এ ব্যাপারে ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর রকিব জানান, মাদকসহ সব অপরাধ দমনে আমরা বদ্ধপরিকর। সর্বশেষ ঘটনায় আহত হুমায়ুন খন্দকারকে আমরা ইতোপূর্বে ইয়াবাসহ আটক করেছি। আমাদের কাছে আসা তথ্যমতে হামলাকারী ও হামলার শিকার উভয়ই মাদকের সাথে জড়িত রয়েছে। তবে আমরা আরো গভীর অনুসন্ধান করছি।
১৯ জুলাই, ২০২০।
