ফরিদগঞ্জে চলাচলের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা

দুর্ভোগে দুইশ’ পরিবার

ফরিদগঞ্জ ব্যুরো
ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের চরমথুরা গ্রামের আখন বাড়ির মসজিদ হতে মিন্নত আলী পাটওয়ারী বাড়ির সড়কে গণমানুষের চলাচলের গ্রামীণ রাস্তায় বেড়া দেয়াসহ হুমকি-ধমকি দেওয়ার মাধ্যমে ওই পথে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার অভিযোগ উঠেছে একটি পরিবারের বিরুদ্ধে। ফলে এলাকার লোকজন এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ওই গ্রামের অন্তঃত ২শ’টি পরিবারের লোকজন। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ থাকলেও বিষয়টি সমাধান হচ্ছে না।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। দ্রুত এই পরিস্থিতির সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী, অভিযুক্ত পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মানুষদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উল্লেখিত রাস্তাটি স্বাধীনতার আগে থেকেই সরু পথ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে গ্রামের মানুষজন। রাস্তাটির একপাশে ডোবা, অন্য পাশে মালিকানা সম্পত্তি। কিন্তু মালিকানা সম্পত্তি প্রায় ৫০ বছর আগে মালিকদের টাকার প্রয়োজন হলে প্রতিবেশীদের কাছে মানুষের চলাচলের জন্য জায়গা রেখে বাকি সম্পত্তি বিক্রি করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যদিও ওই রাস্তা দিয়ে এলাকার প্রায় ২শ’ পরিবারের মানুষজন হেঁটে চলাচল করতে পারলেও কোনো রিক্সা, অটোরিক্সা চলাচলের উপযোগী ছিলো না। এতে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে মারা যাওয়া ওই এলাকার মানুষ জনের মরদেহ ও অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে ভুক্তভোগীরা পড়তে হয় মহাবিপাকে। বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের দৃষ্টিগোচর হলে গত কয়েক বছর আগে সড়কটিতে একটি প্রজেক্ট দিয়ে মেরামত করে দেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় একটি কুচক্রী মহলের ইন্ধনে অভিযুক্ত পরিবারটি ওই রাস্তাটির পাশে পর্দার নামে বেড়া দেয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে।
স্থানীয় সচেতনজনদের মধ্যে বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ও অভিযুক্ত পরিবারটি সাথে বিষয়টি অনেক আগেই সমাধান হয়ে যেতো। যেহেতু সবগুলো মানুষই সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু স্থানীয় একটি কুচক্রী মহল সালিস ও দরবারের বৈঠকের নামে স্থানীয় মেম্বার, চেয়ারম্যান, পুলিশ প্রশাসনকে এড়িয়ে নিজেরা সমাধান করবে বলে বিশেষ সুবিধাগ্রহণের মধ্য দিয়ে সামান্য বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী করে রেখেছে।
সরেজমিনে গেলে স্থানীয় বাসিন্দা মো. মোস্তফা কামাল (৬৫), মো. আলী আহাম্মদ (৬৫), বাবুল পাটওয়ারী (৬০), আলী আক্কাছ মিজি (৮০), সৈয়দ আহম্মদ (৬৫), বাচ্চু মিজি (৭০), নান্নু পাটওয়ারী (৬০), আবুল কাশেম পাটওয়ারী (৮০), জাকির পাটওয়ারী (৪০), আব্দুর রহমান (৫৩) ও গ্রাম পুলিশ সদস্য মোসাদ্দেক হোসেনসহ বেশ কয়েকজন জানান, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সরু এই সড়কটি দিয়ে মিজি বাড়ি, দেওয়ান বাড়ি, বড় বাড়ি, মুন্সি বাড়ি, ছৈয়াল বাড়ি, আখন বাড়ি, মতি পাটওয়ারী বাড়ি, সলেমান পাটওয়ারী বাড়ি, নুরু পাটওয়ারী বাড়ি, সৈয়দ আহম্মদ পাটওয়ারী বাড়িসহ কয়েকটি বাড়ির লোকজন পায়ে হেঁটে চলাচল করতো। কোনো রিক্সা কিংবা বর্তমানে ব্যাটারিচালিত কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারতো না। আবার এসব বাড়ির লোকজন নামায আদায় করতে আখন বাড়ির মসজিদে যেতো। তবে, এসব বাড়ির কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়া কিংবা কেউ মারা গেলে জানাযার জন্য বাড়ি থেকে বের করা দুরহ হয়ে পড়তো। গণমানুষের এসব ভোগান্তি লাঘবের জন্য বিগত ২০২০-২১ অর্থ বছরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)’র আওতায় (প্রকল্প নং-৫৩) উক্ত সড়কটি সামান্য প্রশস্ত করে মেরামত করা হয়। এরপরই স্থানীয় ছৈয়াল বাড়ির আবুল হোসেন ছৈয়াল (৬৫) গং রাস্তাটির পাশে খুঁটি গেড়ে প্লাস্টিক ও সুপারির গাছের ডাল দিয়ে বেঁড়া দেয়। ফলে রাস্তাটি দিয়ে চলাচলে সামান্য বিঘ্ন ঘটছে।
এ নিয়ে আবুল হোসেন ছৈয়াল গংদের সাথে ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারীদের একাধিকবার মারামরির ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে এ ব্যাপারে আবুল হোসেন ছৈয়াল বাদী হয়ে ৫ জনের বিরুদ্ধে চাঁদপুর আদালতে মামলাও দায়ের করেন। যদিও পরে মামলাটি থেকে প্রতিপক্ষদের অব্যাহতি দেয়া হয়।
স্থানীয়রা আরো জানান, আবুল হোসেন ছৈয়ালের বাবা ফজলের রহমান জীবিত থাকাকালে ১৯৭৫ সালের ২ আগস্ট চরমথুরা মৌজায় ৯০৪ নং দাগে আবুল কাশেম পাটওয়ারী ও তার ভাই আবুল হাশেম পাটওয়ারী থেকে ২৬২৬ নং দলিল মূলে ১২ শতক জমি ক্রয় করেন। ঐ দাগে আরো ৯ শতক জমি এখনো অবিক্রিত রয়েছে। ফজলের রহমান জমি ক্রয় করার আগে থেকে সরু এই সড়কটি ছিলো, যা বর্তমানেও রয়েছে।
আবুল কাশেম পাটওয়ারী ও তার ভাই আবুল হাশেম পাটওয়ারী জানান, তারা নিজেদের ও প্রতিবেশীদের চলাচলের সুবিধার্থে সড়কের জমি রেখেই তারা বাকি জমি বিক্রি করেন। দীর্ঘদিন পর সম্প্রতি ফজলের রহমানের ছেলে আবুল হোসেন ছৈয়াল গং ঐ সড়কটি তাদের খরিদকৃত জমির সীমানায় পড়েছে বলে দাবি করে বেড়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আবুল হোসেন ছৈয়াল জানান, সড়কটি তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। এতদিন মাপ-জরিপ ছাড়াই যে যার মতো করে ভোগ-দখল করেছে। কিছুদিন আগে মাপ-জরিপ করে দেখেছি ঐ রাস্তা ছাড়াও বাইরে আরো কয়েক হাত জমি আমাদের রয়েছে। রাস্তার পাশেই তার বাড়ি। বাড়ির পর্দা হিসেবে প্লাস্টিক ও সুপারি গাছের ডাল দিয়ে বেঁড়া দিয়েছি।
এতে তো প্রতিবেশী কয়েকটি বাড়ির জনসাধরণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এটি আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। চলাচলের বিঘ্ন ঘটলে তারা কিভাবে আমাদের কাছ থেকে সে সুবিধা পেতে পারে তার জন্য একটি সমঝোতা প্রয়োজন। তারা অন্যায়ভাবে আমাদের গালিগালাজ করে, আমাদের মারধর করে কিংবা জোর করে তো ভোগদখল করতে পারে না। আমরা তাদের সুবিধা দিতে প্রস্তুত, কিন্তু তারা নিতে জানে না।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. শাহ আলম শেখ বলেন, আমার পূর্ববর্তী চেয়ারম্যানের আমলে একটি প্রজেক্ট দিয়ে রাস্তাটিতে কাজ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের চলমান সমস্যার কথা জানতে পেরে বিষয়টি আমি সরেজমিন তদন্ত করেছি। ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের মহতী উদ্যোগই সমাধানের পথ সহজ হবে বলে আমি মনে করি। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে বাকি ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

২২ নভেম্বর, ২০২২।