ফরিদগঞ্জে স্কাউট প্রশিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ

লিখিত অভিযোগের প্রায় দুই মাসেও বিচার পায়নি

স্টাফ রিপোর্টার
ফরিদগঞ্জ স্কাউটের সাবেক উপজেলা সাধারণ সম্পাদক ও মেঘনারপাড় মুক্ত স্কাউটের সাধারণ সম্পাদক কর্তৃক স্কাউট লিডার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ওই শিক্ষার্থী বিচার চেয়ে উপজেলা কমিশনার, মেঘনারপাড় মুক্ত স্কাউটের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মাহফুজুল হকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রায় দুই মাস পার হলেও বিচার পায়নি ওই শিক্ষার্থী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলার স্কাউট নেতৃবৃন্দ ও সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠেছে। অভিযোগের পরও কেন ওই শিক্ষকের বিচার হয়নি এমন দাবি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্কাউটদের।
ঘটনার সূত্র ধরে জানা যায়, গত বছর ১৭ থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফরিদগঞ্জ উপজেলার পিএল কোর্সের আয়োজন হয় গাজীপুর মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ে মাঠে। ৫ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন ৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষার্থী। ৫ দিনের অনুষ্ঠানটি শেষ হয় ৪ দিনে। ১৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাত আনুমানিক ১০টার সময় একজন স্কাউট লিডার স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালনকালে তাকে ডেকে তার রুমে নেন মেঘনারপাড় মুক্ত স্কাউটের সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা স্কাউটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিতেশ শর্মা।
এসময় তিনি ওই শিক্ষার্থীর সাথে জোরপূর্বক যৌন হয়রানির চেষ্টা করলে মেয়েটি দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। পরদিন সকালে মেয়েটি ঘটনাটি স্কুলের স্কাউট টিচার ও ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষক মহিউদ্দিনের কাছে বলেন। শিক্ষক মহিউদ্দিন অনুষ্ঠানের পরে বিষয়টি নিয়ে দেখবেন বলে আশ^াস প্রদান করেন। কিন্তু ওই ঘটনার দেড় মাস পার হলেও কোন প্রকার বিচার না পেয়ে মেয়েটি উপজেলা স্কাউটের কমিশনার, মেঘনারপাড় মুক্ত স্কাউটের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মাহফুজুল হকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রায় ২ মাস পার হলেও কোনরূপ ব্যবস্থাগ্রহণ করেনি উপজেলা স্কাউট কমিটি।
ঘটনার শিকার ওই স্কাউট সদস্য জানান, আমাদের স্কুলে স্কাউটের পিএল কোর্সের জন্য ৫ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ঐ অনুষ্ঠানে আমি স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করেছি। সেই সময় উপজেলা স্কাউটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মেঘনারপাড় মুক্ত স্কাউটের সাধারণ সম্পাদক হিতেশ শর্মা স্যার আমাকে তার কাছে যাওয়ার জন্য ডাক দেন। আমি গেলে স্যার আমার সাথে অশালীন আচরণ করেন। পরে আমি দৌঁড়ে পালিয়ে যাই। পরদিন সকালে আমি সবার নাস্তা দেওয়ার সময় তিনি আবার অশ্লীল কথা বলেন। ঘটনাটি আমি আমার স্কুল টিচার মহিউদ্দিন স্যারকে বলি। তিনি বিষয়টি পরে দেখবেন বলে আমাকে আশ^াস প্রদান করেন। বিচার না পেয়ে বাধ্য হয়ে আমি উপজেলা স্কাউটের কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করি। আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার আমি বিচার চাই। আমি চাই না আমার মতন কোন মেয়ের সাথে এই রকম ঘটনা হোক।
গাজীপুর মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মহিউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি যখন ঘটেছিল মেয়েটি তখনই আমাকে বলেছে। আমি বিষয়টি স্কুল প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ স্যারকে জানাই। তিনি ব্যবস্থাগ্রহণ করবেন। তিনি কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ না করায় শিক্ষার্থী আবারও আমার কাছে অভিযোগ করেন। এই ঘটনার বিচার দাবি করেন। পরে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ফরিদগঞ্জ উপজেলার স্কাউট কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয় ওই শিক্ষার্থী। আমরা চাই এর বিচার হোক।
এ বিষয়ে গাজীপুর মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ বলেন, ঘটনাটি আমি গত কয়েকদিন আগে শুনেছি। আমি মেয়েটি ডেকে জিজ্ঞাসা করেছি। সে আমার কাছে সব বিষয় বলেছে। আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাছে বলার জন্য অনেকদিন গিয়েছিলাম, কিন্তু স্যারকে পাইনি। এতদিন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থাগ্রহণ করেননি কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন কথা বলতে পারেননি।
উপজেলা স্কাউট লিডার জিয়া উদ্দিন বলেন, আমি ঐ অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসাবে ছিলাম। বিষয়টি আমরা শুনেছি। হিতেশ স্যার দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছে। আমরা কিছু বললে তিনি রেগে যান এবং জেলা কমিটির কাছে অভিযোগ করেন। তাই আমরা ভয়ে কিছু বলি না।
অভিযুক্ত উপজেলা স্কাউট সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মেঘনারপাড় মুক্ত স্কাউটস ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিতেশ শর্মা বলেন, আগামিতে আমি সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করবো, তাই তারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য এ কাজ করেছে। আমি ৩০ বছর শিক্ষকতা করেছি, কখনো কোন খারাপ কাজ করি নাই। আমি দুষ্টামি করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলি- শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেওয়া জন্য।
ফরিদগঞ্জ স্কাউটস কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের কমিশনারের কাছে মেয়েটি একটি অভিযোগ করেছে। এ বিষয়টি ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেছে, বসে মিমাংসা করে দিবে। বিষয়টি কেন উপজেলা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে জানানো হয়নি এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমরা বাড়তে দেয়নি এবং নিজেরা মিমাংসা করতে চেয়েছি।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্কাউট কমিশনার, মেঘনারপাড় মুক্ত স্কাউটসের সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মাহফুজুল হক বলেন, প্রায় দুই মাস আগে আমার কাছে একটি মেয়ে অভিযোগ করেছে হিতেশ শর্মার বিরুদ্ধে। আমি ঘটনা জানার পর ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তদন্তপূর্বক ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

০১ এপ্রিল, ২০২২।