জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভায়
এস এম সোহেল
চাঁদপুর জেলা মাসিক উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান।
তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, চাঁদপুর জেলায় গত চার বছরে ৭০ কোটি টাকার সোলার বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণকৃত সোলারগুলো কাজ করছে কি-না, কিংবা সোলারের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা’ খতিয়ে দেখতে হবে। সোলারের বিদ্যুৎ আগে ব্যবহার করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, চাঁদপুর মাদকমুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে আমরাই সাহস দেখিয়েছি চাঁদপুরকে মাদকমুক্ত করার জন্য। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে চাঁদপুরে একটি অ্যাপস্ ও সফট্ওয়্যার তৈরীর কাজ চলছে। এই অ্যাপস্ ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাতে কমেন্ট করে তাদের এলাকার মাদকের ব্যাপারে জানাতে পারবে। মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে ওই এলাকা গণ্য করা হবে যে এলাকায় কমপক্ষে ৯৫ ভাগ মাদকমুক্ত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে মেধা ও প্রযুক্তি ডিজিটাল বাংলাদেশ। ডিজিটাল কথাটিতে যে কত মজা রয়েছে, যে খুঁজবে সে’ই মজা নিতে পারবে। চাঁদপুরের সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ আব্দুল হাই একটি সফট্ওয়্যার তৈরি করেছেন যে সফট্ওয়ারের মাধ্যমে গাড়ির সামনে ক্যামেরা থাকবে। আপনার গাড়ি কোথায় আছে কিভাবে চলছে, সড়ক দুর্ঘটনাগুলো কিভাবে হচ্ছে এখানে কার দোষ কতটুকু সব রেকর্ড থাকবে। আমি আমার গাড়িতে এই ক্যামেরা লাগিয়েছি। আপনারা আপনাদের গাড়িতে এই ক্যামেরাটি লাগাতে পারেন।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচন সামনে। এখন কোন কর্মকর্তাকে বদলি করা যাবে না। নির্বাচন উপলক্ষে স্ব-স্ব দপ্তরগুলোতে শুক্রবার ও শনিবার অফিস করতে হবে। নির্বাচনের সরকারি কর্মকর্তাদের গুরুদায়িত্ব রয়েছে। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনী কাজে জেলা রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে সাহায্য করবে।
সভায় বিগত মাসের কার্যবিবরণী পাঠ করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শওকত ওসমান। সভায় স্ব-স্ব বিভাগের বিভিন্ন দিকের বর্তমান অবস্থান তুলে ধরেন বিভাগের কর্মকর্তারা।
সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটওয়ারী দুলাল, চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. এ এস এম দেলওয়ার হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. জাহেদ পারভেজ চৌধুরী, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা কেবিএম জাকির হোসেন, জেলা পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ইলিয়াছ, শাহরাস্তি উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মিন্টু, ফরিদগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাহফুজুল হক, অ্যাড. সাইফুদ্দিন বাবু প্রমুখ।
সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী, সিভিল সার্জন ডা. মো. সাইদুজ্জামান খান, এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী জিএম মুজিবুর রহমান, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহাদাত হোসেন, জেল সুপার মো. মাইন উদ্দিন, জেলা পরিষদের সচিব মো. মিজানুর রহমান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আবদুর রশিদ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা, হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বৈশাখী বডুয়া, কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নীলিমা আফরোজ, মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার, জেলা নির্বাচন অফিসার মো. হেলাল উদ্দিন খান, জেলা সমাজসেবা অফিসার রজত শুভ্র সরকার, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ, ২৫০ শয্যা সরকারি জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহবুব আলম, গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, জেলা শিক্ষা অফিসার মো. সফিউদ্দিন, জেলা মৎস্য অফিসার মো. আসাদুল বাকী, যুব উন্নয়নের উপ-পরিচালক সামসুজ্জামান খান, জেলা তথ্য অফিসার নুরুল হকসহ স্থানীয় সব দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ।
সভায় ই-গভার্ন্যান্স কার্যক্রম সংক্রান্ত প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিটি বিভাগকে তাদের কার্যক্রম জেলা ওয়েব পোর্টালে আপলোড ও আপডেট করতে হবে। এটি একটি তথ্য ভান্ডার। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে লেখা তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। তাছাড়া সব দপ্তরের প্রকল্পের তালিকা পোর্টালে দেয়া হয়েছে কিনা তা যাচাই করে দেখার জন্য সহকারী কমিশনার ও আইসিটি শাখাকে নির্দেশ দেয়া হয়। আগামি ১ মাসের মধ্যে সব বিভাগ এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার চাঁদপুর ই-ফাইলে কাজ করার জন্য অনুরোধ জানান।
জাতীয় পর্যটন সংস্থা প্রসঙ্গে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো পর্যটন খাত থেকে কাক্সিক্ষত আর্থিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়/ সংস্থাসমূহের উন্নয়ন পরিকল্পনা পর্যটনকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
জেলা পরিষদ প্রসঙ্গে বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের জেলা পরিষদের রাজস্ব খাতে গৃহিত প্রকল্পের সংখ্যা ৬০২টি। এর মধ্যে ৫০২টি প্রকল্পের সম্পন্ন হয়েছে। ১০০টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এছাড়াও এডিপি, এডিপি সংরক্ষিত খাতে গৃহিত প্রকল্পের সংখ্যা ৩১৬টি। এর মধ্যে ২৩৬টি সমাপ্ত এবং ৫৮টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ প্রসঙ্গে বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম সুন্দরভাবে চলছে। প্রস্তাবিত ২৯১টি কমিনিউটি ক্লিনিকের মধ্যে ২১৮টি চালু রয়েছে। ই-হেলথ কার্যক্রম সেপ্টেম্বর মাসে শাহরাস্তি উপজেলায় ৫৮ জন, ফরিদগঞ্জ উপজেলায় ৬৪জন, মতলব উত্তর উপজেলায় ৪২জন, মতলব দক্ষিণ উপজেলায় ২০জন, হাজীগঞ্জ উপজেলায় ১২৬জন, হাইমচর উপজেলায় ১৯জন এবং কচুয়া উপজেলায় ২৯জন রোগীকে স্কাইপি/ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সেবা দেয়া হয়। সেবাপ্রাপ্তি রোগীর সংখ্যা মোট ৩৫৮জন। সেপ্টেম্বর মাসে ২৭টি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এর মাধ্যমে ৫৮২৪জন রোগীকে সেবা দেয়া হয়েছে। অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
২৫০ শয্যা সরকারি জেনারেল হাসপাতাল প্রসঙ্গে বলেন, চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ, জরুরি বিভাগ, বহিঃবিভাগ ও প্রসূতি বিভাগের কার্যক্রম সন্তোষজনক। হাসপাতালে নিয়ে আসা রোগী/রোগীদের সাথে থাকা লোকজন দালালদের মাধ্যমে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে। প্রতিদিন হাসপাতালের আউটডোরে যেসব চিকিৎসক রোগী দেখেন তাদের কক্ষের সামনে দালালরা উপস্থিত হয়ে রোগীদের হয়রানি ও প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। হাসপাতালে নিয়মিত পুলিশ টহল এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলে দালালদের দৌরত্ম্য অনেকটা রোধ পাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রসঙ্গে বলেন, রোপা আমন লক্ষ্যমাত্রা ২৪৭১৭ হেক্টর, অর্জন ২৫৭৭০ হেক্টর। আউশ আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ১০৩০৯ হেক্টর, অর্জন ৯১৩৫ হেক্টর। সারের মূল্য ও বিতরণ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে। বর্তমানে ইউরিয়া সার মজুত রয়েছে ২১৮৩ মেট্রিক টন, টিএসপি সার মজুত রয়েছে ৪৯০ মেট্রিক টন, এমওপি সার মজুত রয়েছে ২০০ মেট্রিক টন এবং ডিএপি সার মজুত রয়েছে ১১৬ মেট্রিক টন। আপাতত কোন সমস্যা নেই।
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ প্রসঙ্গে বলেন, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সেপ্টেম্বর মাসে চাঁদপুর জেলার সার্বিক কাজের মান সন্তোষজনক। সেপ্টেম্বর মাসে ২৮ জন পুরুষ ও ১৪৩ জন নারী স্থায়ী পদ্ধতি, ২৯১ জন আইইউডি এবং ৪৪৫ জন ইমপ্ল্যান ব্যবস্থাগ্রহণ করেছেন।
সড়ক ও জনপদ বিভাগ প্রসঙ্গে বলেন, চাঁদপুর সড়ক বিভাগের রাস্তাগুলো সংস্কার/মেরামত কাজ চলমান রয়েছে। গৌরিপুর-কচুয়া-হাজীগঞ্জ সগকের যথাযথমানে উন্নীতকরণ প্রকল্পটি একনেক কর্তৃক এবং দোয়াভাঙ্গা-শাহরাস্তি-পানিওয়ালা (রামগঞ্জ) যথাযথমান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ শীর্ষক প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রসঙ্গে বলেন, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের আওতায় ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে মোট ২৮৫৭৫.০৩ লাখ টাকা ব্যায়ে ৩৬৬ টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। ৩১১টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে, যা প্রায় ৪৭ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রসঙ্গে বলেন, ১৯০৭৭.০৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মেঘনা নদী ভাঙন হতে চাঁদপুর জেলার হরিণা ফেরিঘাট এলাকা এবং চরভৈরবী এলাকার কাটাখাল বাজার রক্ষা কাজ চলমান রয়েছে।
মেঘনা-ধনাগোদা পাওর ভিভাগ প্রসঙ্গে বলেন, চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলাধীন ষাটনল ইউনিয়নের মলোপাড়া গ্রামকে মেঘনা নদীর ঢেউয়ের ভাঙন হতে রক্ষার্থে প্রতিরক্ষামূলক কাজে ৪০৭.২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যার বাস্তব অগ্রগতি ৯৫ ভাগ।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রসঙ্গে বলেন, জেলার ৮টি উপজেলায় ১২টি প্রকল্পের আওতায় ১৩৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫৩৭৮.৭৪ লাখ টাকার কাজ চলমান রয়েছে। যা প্রত্যেকটি ৬৮ ভাগের উপরে রয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিস প্রসঙ্গে বলেন, চাঁদপুর জেলায় আইসিটি সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০৫টি। মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম সক্রিয় রয়েছে ৪৬৭টি। সার্বিক কাজের মান সন্তোষজনক।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অফিস প্রসঙ্গে বলেন, জেলার ২৬টি গুদামে বর্তমানে মোট ১০১২৮.৪০ মেট্রিক টন চাল, ১৪১২.৫৫৭ মেট্রিক টন গম মজুদ রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন খাতে ২০৭০.৯২২ মেট্রিক টন চাল ও ২৫৬.৬০৪ মেট্রিক টন গম বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস প্রসঙ্গে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে ৬২৩৬টি গবাদি প্রাণি এবং ৩৩২৬০০টি হাঁস-মুরগীকে টিকা প্রদান করা হয়েছে। মোট ৯৩৩৫টি গবাদি প্রাণি এবং ১০৭৫৩৯টি হাঁস-মুরগীকে চিকিৎসা প্রদান করা হগয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স প্রসঙ্গে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে ২১টি অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। ৩৩ লাখ টাকার মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
