প্রথমবারের মতো কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে না কুমিল্লায়, সংস্কৃতি অঙ্গনে ক্ষোভ!
জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২২তম জন্মবার্ষিকী ছিল গতকাল ২৪ মে। প্রতিবছর কবির জন্মবার্ষিকীতে কুমিল্লায় আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানমালা। এদিকে একই সাথে কবির কুমিল্লায় আগমণেরও শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে এবছর। সবমিলিয়ে কবির স্মৃতিবিজড়িত এই কুমিল্লায় এবার ধুমধাম করে পালন করার কথা ছিলো এ দিনটি।
এর আগে গেলো ১৬ মার্চ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কুমিল্লায় আগমণের শতবর্ষ উদযাপনের উপলক্ষে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের সমে¥লন কক্ষে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা থেকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কুমিল্লায় আগমণের এই শতবর্ষকে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
এ লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি উপ-কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয় সেসব কমিটির প্রস্তাবনা অনুযায়ী বছরব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নজরুলের কুমিল্লায় আগমণের শতবর্ষটি স্মরণীয় করে রাখা হবে। অথচ এবার কোনো অনুষ্ঠানই হচ্ছে না। আর তাই কুমিল্লা জুড়ে যেন শুনশান নীরবতা। শুধু কুমিল্লা শহরেই নয়, যেখানে যুবক নজরুল নার্গিস আসার খানমের প্রেমে পড়েন, কবির স্মৃতিবিজড়িত মুরাদনগরের সেই দৌলতপুরেও নেই কোনো কর্মসূচি।
এতে ক্ষুব্ধ জেলার সংস্কৃতি অঙ্গণের বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, করোনাকালেও দেশে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অনেক অনুষ্ঠান হতে দেখা গেছে। নজরুলের ঐতিহাসিক এই দিনটিও পালন করা যেতো স্বাস্থ্যবিধি মেনেই।
নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র কুমিল্লা’র প্রশিক্ষক, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পী কাজী মাহতাব সুমন জাতীয় কবির কাণ্ডারী হুঁশিয়ার কবিতার উদৃতি দিয়ে বলেন, জাতীয় কবির জন্মদিনে কোনো অনুষ্ঠান হবে না, এ বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তিনি বলেন, আমরা মানছি যে, করোনা-লগডাউন, কিন্তু এটাওতো সত্য যে সবকিছুইতো হচ্ছে। এ বছরটি ছিলো কবির কুমিল্লায় আগমণের শত বছর। এবছর আমরা কিছুই করতে পারিনি, এ বিষয়টি আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
ইতিহাস ঐতিহ্য গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, জাতীয় কবির ১২২তম জন্মবার্ষিকীর পাশাপাশি জাতীয় কবিরও কুমিল্লায় আগমণের শতবর্ষ এটি কুমিল্লাবাসীর ইতিহাসের একটি গৌরবজনক অধ্যায়। এ অধ্যায়টিকে এভাবে নীরবে নিভৃতে চলে যেতে দেয়া সমিচীন বলে মনে করি না।
তিনি বলেন, আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। এবছর জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী এবং আমাদের জাতীয় কবিরও কুমিল্লায় আগমণের শতবর্ষ। সুতরাং এটি হতে পারতো একটি অসম্ভব মেলবন্ধনের আয়োজন। কিন্তু এ ব্যাপারে কুমিল্লার প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্টরা একেবারে নীরব থাকায় আমি কুমিল্লাবাসী হিসেবে অত্যন্ত মর্মাহত এবং ব্যাথিত।
এদিকে জেলা প্রশাসকের দৈনন্দিন সরকারি কর্মসূচিতেও ছিলো না নজরুল প্রসঙ্গ। এ নিয়ে কথা উঠলে ২৪ তারিখ সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় নতুন করে আরেকটি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তবে, জেলা প্রশাসনের অংশগ্রহণে সকালে কবির ম্যুরালে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং নজরুল ইন্সটিটিউট কুমিল্লা কেন্দ্রের উদ্যোগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভার্চুয়াল আলোচনা অনুষ্ঠান করা হবে। এমনটাই জানালেন, জেলা কালচারাল অফিসার সৈয়দ মোহম্মদ আয়াজ মাবুদ এবং নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র, কুমিল্লার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল-আমীন।
এ বিষয়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসানের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণেই সব ধরনের কর্মসূচি সীমিত করা হয়েছে।
১৯২১ সালের ৫ এপ্রিল কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের কলকাতার বিশিষ্ট পুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খানের সাথে প্রথমবারের মতো কুমিল্লায় আসেন নজরুল। এরপর তিনি আলী আকবর খানের বোনের মেয়ে নারগিস আশার খানমের সাথে প্রেমে জড়ান, বিয়ে করেন। অবশেষে তাদের এ বিয়ে স্থায়ী না হলেও পরে তিনি বিয়ে করেন কুমিল্লা শহরের প্রমিলা দেবীকে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের অবিচ্ছেদ একটি অংশ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কুমিল্লা। কবির প্রেম, বিয়ে, বিরহের পাশাপাশি সংগীত ও সাহিত্য চর্চা, আন্দোলন সংগ্রাম এবং কারাবরণের ইতিহাস রচিত হয়েছে এই কুমিল্লায়। বলা হয় কাজী নজরুল ইসলাম একজন কবি হয়ে উঠতে এই কুমিল্লা অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কবির তারুণ্যের দুরন্ত সময়গুলোর সাক্ষী হয়ে আছে এই কুমিল্লা।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, ঐতিহ্য কুমিল্লার উপদেষ্টা ড. আলী হোসেন চৌধূরী বলেন, কবি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কুমিল্লায় নজরুল চর্চা অনেকটাই পিছিয়ে আছে। এসব কিছুর বিবেচনায় কুমিল্লাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের আমলে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র। নজরুল জাদুঘর, লাইব্রেরী, নজরুল সংগীতের বিভিন্ন কোর্সে অংশগ্রহণ করে নতুন প্রজন্ম যাতে সঠিকভাবে সুন্দরভাবে নজরুল চর্চা করতে পারে। নজরুল চর্চা বেগবান করতে এখানে নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হলেও নানা সীমাবদ্ধতায় নজরুল চর্চা এখনো তেমনভাবে বিকশিত হয়নি। এখানে নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণ ও নজরুল চর্চা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন এই নজরুল গবেষক।
২৫ মে, ২০২১।
