স্টাফ রিপোর্টার
ব্যাপকহারে জাটকা নিধন, নদীতে অসংখ্য ডুবোচর, মেঘনায় অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন, জাটকা সংরক্ষণ ও মা ইলিশ ডিম দেয়ার সময়ে শত-শত ড্রেজারের মাধ্যমে রেনু বিনষ্ট এবং
দক্ষিণাঞ্চলের ফিসিং জোন এলাকায় একত্রে অনেক জেলে ইলিশ শিকারের কারণে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় এবার ইলিশের দেখা মিলছে না। জেলেদের জালে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এখন ইলিশের ভরা মওসুম চলছে। বরাবরই সাগর উপকূলীয় অঞ্চলের ইলিশে ভরপুর থাকে এখানকার ইলিশের বাজার। দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় এখন যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো। তাছাড়া সেসব এলাকার নানাস্থানে মাছের আড়ৎ ও বাজার গড়ে ওঠেছে। তাই চাঁদপুরের বাজারে ইলিশের আমদানিও অনেক কমে গেছে।
চাঁদপুর সদরের রামদাসদী এলাকার জেলে হাশিম জমাদার বলেন, ইলিশের মৌসুম চলে যাচ্ছে, আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে, ইলিশ পাচ্ছি না। সুদে ও কিস্তিতে টাকা এনে জাল ও নৌকা তৈরি করেছি। অথচ পদ্মা-মেঘনা নদীতে মাছ নাই। অপরদিকে মৌসুম আর এক মাস বাকি আছে। ইলিশ পাইতেও পারি, নাও পাইতে পারি। ইলিশ না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদীর দুই পাশে গভীর হলেও মাঝখানে অনেক ডুবোচর। আবার সদর উপজেলার উত্তর পাশে মেঘনায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব কারণে নদীর গতিপথ ও আচরণ পরিবর্তন হচ্ছে।
পুরাণবাজার রণাগোয়াল এলাকার জেলে আবুল প্রধানিয়া বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের দেয়া নিষেধাঞ্জা এক শ্রেণির জেলে মানছে না। আবার অনেকে সরকারি লোকজন ও নেতাদের মাধ্যমে সুযোগ নিয়ে নিষেধাজ্ঞার সময় বেআইনিভাবে নদীতে মাছ ধরে। যখন মা ইলিশ ডিম দেয়, সেই ডিম গভীর পানির নিচে মাটির সাথে থাকে। ওই সময়ে ড্রেজারের শত শত পাইপে বালুর সাথে ইলিশের ডিমও উপরে চলে আসে। জেলে মনির গাজী বলেন, আমরা ইলিশ না পাওয়ার কারণ হচ্ছে শুকনো মৌসুমে এক শ্রেণির জেলে ইলিশের বাচ্চা মারে। ইলিশ না পেয়ে আমাদের এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। খেয়ে না খেয়ে কষ্ট করতে হচ্ছে। ঋণগ্রস্ত হয়ে গেছি এবার। অথচ যখনই নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়, তখন আবার আসে নিষেধাজ্ঞা।
সদর উপজেলার হানারচর ইউনিয়নের হরিণা ফেরিঘাট সংলগ্ন মাছঘাটের প্রবীণ মাছ ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম ছৈয়াল বলেন, ইলিশ না পাওয়ার কারণ হচ্ছে নদীতে অনেক চর জেগে ওঠেছে। সাগর থেকে নদীর যে স্থান দিয়ে ইলিশ উজানে আসে সেখানে দুই পাশে চর জেগে ওঠেছে। মাঝখানে যে জায়গাটুকু খালি সেখানে অনেক জাল দিয়ে বাধাগ্রস্ত করে। যার ফলে এবার পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ খুবই কম। একই এলাকার জেলে মনির গাজী বলেন, এই সময় ইলিশ না পাওয়ার কারণ হচ্ছে শুকনো মৌসুমে এক শ্রেণির জেলে ইলিশের বাচ্চা মারে। ইলিশ না পেয়ে আমাদের এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। খেয়ে না খেয়ে কষ্ট করতে হচ্ছে, ঋণগ্রস্ত হচ্ছি। যখনই নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়, তখন আবার আসে নিষেধাজ্ঞার সময়।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি রোটারিয়ান আব্দুল বারি জমাদার মানিক বলেন, বিগত কয়েক বছরই আমাদের চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে ইলিশের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। এর কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নদীতে অসংখ্য চর জেগেছে, নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে এবং সাগর থেকে যখন মেঘনায় মাছ আসবে সেখানে বরিশাল, হাতিয়া ও ভোলায় অসংখ্য জেলে একসঙ্গে ইলিশ আহরণ করে। এত পরিমাণ জেলে ও জাল পেরিয়ে মেঘনায় ইলিশ আসা খুবই দুরুহ ব্যাপার। তিনি আরো বলেন, চাঁদপুরে ইলিশ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন। সরকার জাটকা রক্ষায় মার্চ-এপ্রিল দুই মাস এবং মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিন সময় নির্ধারণ করেছে, ওই সময়ও অপরিকল্পতিভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। ডিম ছাড়ার সময় যে বালু উত্তোলন হয়, তখন ইলিশের ডিমগুলো মারা পড়ে। এই বিষয়টি মৎস্য বিজ্ঞানীরাও বলেছেন। কারণ মৎস্য বিজ্ঞানী ও জেলেরা নদীতে অবস্থান করেন। তারাই আমাদের সাথে বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, চাঁদপুরে ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়ে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। যেহেতু সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে, আশা করছি অচিরেই প্রচুর পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়বে। গত বছরের তুলনায় এবছর ঠিক এই সময়টাতে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে আমরা ইলিশ কিছুটা কম পাচ্ছি। তবে কয়েকদিন পর জেলেরা ইলিশ পাবে বলে আশা করেন এ কর্মকর্তা।
দেশের ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন সামনে অমাবস্যা আসছে। অর্থাৎ, এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রচুর ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইলিশ প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে একেবারে সুনির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও অমাবস্যা ও পূর্ণিমা ভালো সময়। তাই মৎস্যজীবীদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে।
বর্তমানে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ না পাওয়ায় এ প্রভাব পড়েছে জেলার সব বাজারে। জেলা শহরের বড় স্টেশন মাছঘাটেগত দুই তিন সপ্তাহ ধরে গড়ে ৮০০ থেকে এক হাজার মণ ইলিশ আমদানি হলেও চলতি সপ্তাহে ইলিশের আমদানি ব্যাপকহারে কমে গেছে। চলতি মাসের প্রথম থেকে এ ব্যবসা কেন্দ্রে ইলিশ আমদানি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ মণ। যার ফলে দামও অনেক বেশি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি ইলিশের দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা। ওজন অনুযায়ী দামের পার্থক্য থাকলেও চাঁদপুরের বাজারে গড়ে প্রতি কেজি ইলিশ ১৩০০-১৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কুমিল্লা থেকে নিজস্ব গাড়ি নিয়ে আসা ক’জন ক্রেতা বলেন, প্রতিবছর আমরা এইসময় দলবেঁধে ইলিশ কিনতে এখানে আসি। কিন্তু এবার এসে দেখি ভিন্ন চিত্র। চাঁদপুর ঘাটে ইলিশ কম আসায় দাম বেশি। তাইতো যে পরিমাণ ইলিশ কেনার আশা নিয়ে এসেছিলাম অল্প কয়টা মাছ কিনেছি। গত বছর এই সময়ে ইলিশের দাম আরও অনেক কম ছিল। চাঁদপুর মাছঘাটের খুচরা মাছ বিক্রেতা সাইফুল জানান, বর্তমানে এক কেজি থেকে ১২০০ গ্রাম ওজনের লোকাল ইলিশ প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ হাজার থেকে ৫৭ হাজার টাকা দরে। কেজিপ্রতি ১৩০০-১৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর সাগর অঞ্চলের ইলিশের মণ বিক্রি হচ্ছে ৪৩ কিংবা ৪৪ হাজার টাকা দরে। এছাড়া ৮০০ গ্রামের মাছের মণ ৩৭ হাজার টাকা এবং ৫০০ গ্রামের মণ ২৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চাঁদপুরের নদী অঞ্চলে কাক্সিক্ষত ইলিশ না পাওয়ায় দামও কমছে না। তবে আরো এক সপ্তাহ পর ইলিশের আমদানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত কয়েকদিন মেঘনা উকপূকলীয় জেলে পাড়ার জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ৩-৪ বছর আগেও চাঁদপুরে এই সময়ে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ পাওয়া গেছে। কিন্তু এবার ভরা মওসুমেও সে অবস্থা নেই। তাই এখানকার ব্যবসায়ীদের অনেকে দাদন দিয়ে তাদের লগ্নিকৃত টাকা ওঠে আসা নিয়ে নানা চিন্তার মাঝে আছেন।
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১।
- Home
- চাঁদপুর
- চাঁদপুর সদর
- চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনায় যে কারণে ইলিশ নেই
Post navigation
