ইল্শেপাড় রিপোর্ট
ক্লিন ইমেজের নেতাদের খোঁজে দেশব্যাপী ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করছে। অপরদিকে বিতর্কিত ও হাইব্রীড নেতাকর্মীদের দল থেকে বাদ দেয়ার কর্মকাণ্ডও চলছে। বিগত ১০ থেকে ১৫ বছর যাবত যেসব নেতা অবৈধ উপায়ে বা দলের শক্তি কাজে লাগিয়ে বিত্তশালী হয়েছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের ক্ষয়-ক্ষতি করেছেন তাদের যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। প্রায় মাসখানেক ধরে জাতীয় পর্যায়ে শুরু হয়েছে বিতর্কিতদের ধর-পাকড়। সম্প্রতি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর ঐসব বিতর্কিতদের তালিকা দিতে চিঠি আসছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দাদেরও তালিকা হালনাগাদ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
চাঁদপুরেও অবৈধ উপায়ে বিত্তশালী, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, মেঘনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনসহ নানা অপকর্মে জড়িতদের তালিকা করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যে তাদের তালিকা তৈরি করলেও ইদানিং তা’ হালনাগাদ করছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে চাঁদপুর সদর, হাইমচর, ফরিদগঞ্জ, মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলার বেশ ক’জন নেতা, জনপ্রতিনিধি বা দুর্নীতিবাজ হাইব্রীড নেতা রয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া ফ্রিডম পার্টির সাবেক এক নেতা, বর্তমানে চাঁদপুর পৌর আওয়ামী লীগের এক হাইব্রীড নেতার ব্যাপারে নানা অভিযোগ রয়েছে। ঐসব নেতাদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যে কোন সময় তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানা গেছে।
দেশের রাজনীতিতে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দুর্নীতিবাজ আর অনুপ্রবেশকারীরা শক্ত বলয় তৈরি করতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে। ফলে দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন চিহ্নিতদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ইতোমধ্যে। তার এই দৃঢ় অবস্থানের কারণে কেন্দ্রিয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। তাদের অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যসহ বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, বন্য প্রাণির চামড়া ও বিশাল মাদকের ভান্ডার উদ্ধার করা হয়। যা সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বহু বিতর্কিত নেতা ইতোমধ্যে গাঢাকা দিয়েছেন। আবার তাদের (অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া) কেউ কেউ কৌশল হিসেবে রাজনীতিতে প্রকাশ্য না থেকে নীরবে দর্শক হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছেন প্রধানমন্ত্রী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শেষ পর্যন্ত কি ভূমিকা পালন করেন। এমন পরিস্থিতি এখন সারা দেশের চিত্র বলে জানায়- দলটির তৃণমূল কর্মীরা।
এদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কখন প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেতে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে থাকা জেলাভিত্তিক নেতা-কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের আইনের আওতায় নিয়ে আনেন কি-না তা নিয়ে উদ্বিগ্ন চাঁদপুরে বেশ কিছু নেতাসহ বর্তমান ও সাবেক কিছু জনপ্রতিনিধি। তারা ইতোমধ্যে অবৈধ সম্পদ রক্ষা করার জন্য সর্বমহলে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে নাম না প্রকাশের শর্তে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দাবি করেন, তাদের বর্তমান জেলা কমিটির অভ্যন্তরে হাতেগোণা কয়েকজন দুর্নীতির মাধ্যমে গত এক দশকে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এই কমিটিতে কোন অনুপ্রবেশকারী নেই। তবে চাঁদপুর শহর কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে কথিত ও বিতর্কিত ও বহুল আলোচিত এক ফ্রিডম পার্টির নেতার অবস্থান রয়েছে বলে তারা জানান। এ নেতা ইতোমধ্যে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন টেন্ডার বাণিজ্য করে।
অপরদিকে চাঁদপুরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাউর আছে, সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের কয়েকজন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। তারা কখন কি করছেন বা কোথায় অবস্থান করছেন তা মনিটরিং করা হচ্ছে। এমনকি তারা তাদের অবৈধ টাকা কি পরিমাণ দেশের বাইরে পাচার হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তাদের সংখ্যা হাতেগোনা বলে জানা গেছে দলটি সূত্রে।
তবে দলটির আরেকটি সূত্র বলছে, চাঁদপুরে ইউনিয়ন পর্যায়ের এক নেতা সারা দেশেই মোটামুটি আলোচিত। ঐ নেতা গত এক দশকে অবৈধ উপায়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গোয়ান্দা নজরদারিতে রয়েছেন। অভিযোগ আছে আলোচিত এই পাতি নেতার মাধ্যমে ঢাকায় আটক শীর্ষ পর্যায়ের বিতর্কিত কয়েকজনের টাকা বিদেশ পাচার হয়েছে।
এছাড়া মতলব উত্তরের এক যুবদল নেতা ১০ বছরে আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেন। তিনি মুদি দোকানদার থেকে বর্তমানে কয়েকশ’ কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। তিনি ঢাকার একটি সিটি কর্পোরেশনেরও একজন জনপ্রতিনিধি। সম্প্রতি (২৫ অক্টোবর) জাতীয় দৈনিক ভোরের পাতায় তার অস্বাভাবিক উত্থান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তার এই শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও কর্মকাণ্ড নিয়েও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে গত চাঁদপুর জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কে কে নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে তাদের অবস্থান দলটির কেন্দ্রিয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এমন বিতর্কিত নেতারাও আতঙ্কে আছেন। ফলে যে কোন সময় বিতর্কিত ঐসব নেতারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না বলে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে।
অপরদিকে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এক সভাপতির বিরুদ্ধেও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে ‘দুদক’ তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তিনিও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছেন বলে তার কর্মীরা জানিয়েছেন।
তবে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের সাথে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা নাম প্রকাশ তো দূরের কথা কেউ কোন মন্তব্য করতেও রাজি হননি। প্রত্যেকেই কৌশলে এমন বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে সাধারণ ও তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা দ্রুত জেলাভিত্তিক চিহ্নিত ও হাইব্রীড নেতাসহ তাদের অনুগত মাদক কারবারীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি আগামি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণযোগ্য নেতাদের সবুজ সংকেত দিয়ে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
কারণ হিসেবে তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, আগামি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি এখনই শুরু করতে হবে। নির্বাচনের আগে অনেক হাইব্রীড নেতাদের মাঠে দেখা যায়। ফলে দলের অভ্যন্তরে গ্রুপিং তৈরি হয়। এজন্য তৃণমূলের কর্মীরা দাবি করছেন এখন পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সবুজ সংকেত দিয়ে ভোটের মাঠে প্রস্তুতির সুযোগ করে দিলে সাংগঠনিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে। আর রাগে-অভিমানে কোণঠাসা থাকা কিংবা নিষ্ক্রিয় নেতা আবার সগৌরবে দলের জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করতে পারবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধু কন্যা ও জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত আরো শক্তিশালী হবে। আর সুযোগ সন্ধানীসহ বিতর্কিতরা রাজনীতির পথ হারাবে। ফিরবে জনবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য রাজনীতির সৌন্দর্য্য।
এদিকে আজারবাইজানের বাকুতে সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে ভালো ফল আসছে। সার্বিক দিক থেকে আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখানে যতক্ষণ আছি দেশের কাজ করে যাবো। তিনি আরও বলেন, অপরাধী নিজের দলের হলেও আইন তার আপন গতিতে চলবে। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখবো।
গত শনিবার (২৬ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় আজারবাইজানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালীন আবাসস্থল হোটেল হিলটন বাকুতে এ অনুষ্ঠান হয়।
চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ইতোমধ্যে দুর্নীতি, মাদকের বিরুদ্ধে একটা অভিযানও আমরা করেছি। দুর্নীতি বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুব ভালো ফল আমরা পাচ্ছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আইন তার আপন গতিতে চলবে। আপনারা দেখেছেন যে সেটা কিন্তু চলছে। আমার দলের কেউও যদি কোন কারণে কোন অপরাধ করে সাথে সাথে শাস্তি পায়। কারণ অপরাধী অপরাধীই। আমি অপরাধীকে অপরাধীর চোখেই দেখবো এবং সেটাই আমরা কিন্তু দেখছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি যে পরকে শিক্ষা দিতে হলে আগে নিজের ঘর থেকে শুরু করা উচিত। আমি কিন্তু এখন তাই করছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান। সেটাই আমি করে যাচ্ছি।
গুজব ছড়ানো অপরাধীদের ছাড় দেয়া হবে না জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গুজব ছড়ানো এই ছড়ানো এটা- বাংলাদেশে হঠাৎ একেকটা গুজব ছড়িয়ে খামোকা মানুষ মারা এ রকম জগণ্য অপরাধ করে, আমি বলে দিয়েছি যে সে যেই হোক, যে দলের হোক, তার বিরুদ্ধে আইন তার আপন গতিতে চলবে। আপনারা দেখেছেন যে সেটা কিন্তু চলছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসীদের কল্যাণের সরকারে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরেন। প্রবাসীদের বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল হয় সেভাবে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের সম্মানটা যেন থাকে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে দেশ সমৃদ্ধ করতে, দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনে শিক্ষার্থীদের বিদেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন, সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ, তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত (আজারবাইজানে দায়িত্বপ্রাপ্ত) এম আল্লামা সিদ্দিকী।
