চাঁদপুরে প্রকৃত জেলেরা কষ্টে থাকার পরও মা ইলিশ শিকার করেনি

 

পদ্মা-মেঘনা পাড়ের জেলেদের ২২ দিনের জীবন সংগ্রাম

 

শওকত আলী

চাঁদপুর নৌ-সীমানার সরকারের তালিকাভুক্ত ৫১ হাজার জেলের মধ্যে অনেকেই ও প্রকৃত জেলেরা নিষেধাজ্ঞার এ ২২ দিন অতিকষ্টে থাকার পরও তারা সরকারের নির্দেশনামা মেনে চলায় তারা পদ্মা-মেঘনা নদীতে ডিমওয়ালা মা ইলিশ শিকার করেনি।

শাহজাহান গাজীর বয়স প্রায় ৪৮। সে আপনমনে জাল মেরামত করছেন। তার সাথে রয়েছে আরো কয়েকজন। প্রস্তুতি ইলিশ ধরার। কয়েক দশক নদীতে ইলিশসহ অন্য মাছ আহরণ করেই জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন তিনি। গণমাধ্যমের লোক দেখে বললেন, প্রকৃত জেলেরা মা ইলিশ শিকার করে না, বরং নিরাপদে ডিম ছাড়ার জন্য মা ইলিশকে সুযোগ করে দেয়। আমরা গত ২২ দিন অনেক কষ্টে সংসার চালালেও নদীতে মা ইলিশ শিকার করতে যাইনি। তবে এই সময়টাতে এক শ্রেণির অসাধু জেলে মেঘনা নদীর পশ্চিম পাড়, শরীয়তপুর, মুন্সীগঞ্জ এলাকা থেকে এসে চাঁদপুরের অভয়াশ্রম এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকার করেছে। শুধু অভয়াশ্রম এলাকায় নয়, আল্লাহর দেয়া প্রাকৃতিক এ সম্পদ ইলিশ রক্ষায় নদী পাড়ের সকল জেলার লোকদের সচেতন হওয়া দরকার।

বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের সাখুয়া গ্রামের মেঘনা নদীর পাড় এলাকায় খালে ইলিশ শিকার করার জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে শত-শত জেলেকে।

হাফেজ গাজী, সেলিম পাটওয়ারী ও রশিদ মাঝি নামে ৩ জেলে ইলিশ শিকার করবেন সাগরে। নিষেধাজ্ঞা শেষ। বুধবার মধ্য রাত থেকেই আহরণ করতে পারবেন ইলিশসহ সকল ধরণের মাছ। তাই এসব মাছ ধরার ট্রলারের জাল মেরামতসহ অন্যসব প্রস্তুতি চলছে তাদের। এদের মধ্যে হাফেজ গাজী নামে জেলে জানান, সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা মেনেছি। আজ রাতে অথবা বৃহস্পতিবার সকালে সাগরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হব। দক্ষিণ হাতিয়া সাগর এলাকায় গিয়ে মাছ শিকার করব। একবার গেলে কমপক্ষে একমাস থাকা হয়।

জেলে আজাদ খান জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় আমাদের সরকারিভাবে যে সহায়তা দেয়া হয় তাতে সংসার চালানোর মত তেমন কিছু হয় না। কারণ বাজারে সব কিছুরই দাম বেশি। ২০ কেজির চলে পাই ১০ থেকে ১২ কেজি চাল এ দিয়ে কি হয়। তবে এখন আমরা ইলিশ পাওয়ার আশায় নদীতে নামবো। নদীতে মাছ থাকলে সংসার আবার স্বছল হবে।

একই এলাকার জেলে নজরুল শেখ জানান, ২২ দিন অবসর থাকলেও জাল মেরামত করার মত টাকা ছিলো না। কারণ ব্যবসায়ীরা বাকিতে কোন কিছুই বিক্রি করেন না। এখন আমরা ঋন করে টাকা নিয়ে জাল, সুতা ও নৌকার অন্যান্য সামগ্রী ক্রয় করেছি। সকাল থেকেই জাল মেরামত চলছে। রাতেই ইলিশ আহরণে নামা হবে।

সাখুয়া জেলে পাড়ার এক নারী খোদেজা বেগম। বয়স ৬০ হবে। জেলে পরিবারেরই একজন তিনি। খুবই দীপ্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, জেলে ছবি তোলা, পত্রিকায় ছাপানো আরে আগেই দরকার ছিলো। কারণ আমরা কিভাবে থাকি, আমাদের সংসার কিভাবে চলে আগেই সরকারকে জানানো দরকার। আমাদের বেঁচে থাকার কষ্ট বাস্তবে না দেখলে বুঝা যাবে না।

জেলে আনোয়ার গাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সাংবাদিক ছবি তুইল্যা নিছে, আমাগো পরিবর্তন হয় না, ৪০ কেজির বদলে চাল পাই ১৫ কেজি। বিকল্প কর্মসংস্থানের সেলাই মেশিন পায় মেম্বার-চেয়ারম্যানদের আত্মীয়রা। সরকার চাল দিয়া চেয়ারম্যান ও মেম্বার- বড়লোক বানানোর দরকার নাই। চাল দেয়া বন্ধ করুক।

উল্লেখ্য, পদ্মা-মেঘনার উপকূলীয় এলাকাসহ চাঁদপুর জেলায় ৫১ হাজার ১৯০ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। বছরজুড়ে তারা নদীতে মাছ আহরণ করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অভয়াশ্রম এলাকায় মা ইলিশ শিকার করায় ২২ দিনে ২৩৩ জেলে আটক হলেও ১৭৩ জনের কারাদণ্ড হয়েছে। তারা জেলে দিন গুণছে।

৫ নভেম্বর, ২০২০।